ভয়ংকর ভালোবাসা ও একটি ঘৃণার গল্প: রাজনীতির অসংযত আবেগ ও আগামীর পথ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক একটি দৃশ্য দেশের সচেতন মহলকে ভাবিয়ে তুলেছে। গত মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রীকে যেভাবে সাধারণ শিক্ষার্থী ও সমর্থকদের ভিড় চারপাশ থেকে ঘিরে ধরেছিল, তা যেমন আবেগের বহিঃপ্রকাশ, তেমনি নিরাপত্তার বিচারে অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এই প্রেক্ষাপটে কলামিস্ট মিনার রশীদ তাঁর বিশ্লেষণে তুলে ধরেছেন নিরাপত্তার ঝুঁকি, বিরোধী দলের পরিবর্তিত রাজনৈতিক ধারা এবং ছাত্ররাজনীতির ভবিষ্যৎ।
১. ভালোবাসার বেষ্টনী: যখন নিরাপত্তার জন্য হুমকি জনপ্রিয়তা একজন নেতার বড় শক্তি, কিন্তু সেই জনপ্রিয়তার টানে সাধারণ মানুষের অতি-নিকটবর্তী হওয়া অনেক সময় প্রাণঘাতী হয়ে দাঁড়ায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রধানমন্ত্রীর চারপাশের সেই ভিড় দেখে প্রশ্ন জাগে—নিরাপত্তা প্রটোকল কি তবে ভেঙে পড়েছিল?
ইতিহাসের শিক্ষা: ভারতের রাজীব গান্ধী, পাকিস্তানের বেনজির ভুট্টো কিংবা মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ. কেনেডি—তাঁরা প্রত্যেকেই জনতার অকৃত্রিম ভালোবাসার ভিড়ে কিংবা অভিবাদন নিতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন।
নিরাপত্তা উপদেষ্টার ভূমিকা: একজন নিরাপত্তা উপদেষ্টার কাজ শুধু নেতার পেছনে হাঁটা নয়, বরং প্রয়োজনে 'না' বলার সাহস রাখা। আবেগী ভিড়ে বন্ধু ও শত্রুর পার্থক্য করা অসম্ভব, যা ঘাতকের জন্য সুযোগ তৈরি করে দেয়।
২. বিএনপি ও রবীন্দ্র-অনুরাগ: আদর্শিক বিবর্তন নাকি কৌশল?
সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপির রাজনীতিতে আকস্মিক 'রবীন্দ্রপ্রেম' লক্ষ করা যাচ্ছে। দলটির চিরচেনা পরিমিতিবোধ ছাপিয়ে এই আবেগ অনেককেই বিস্মিত করেছে।
কৃষি ভাবনা: রবীন্দ্রনাথ বনাম জিয়া: বিএনপি মহাসচিবের মুখে রবীন্দ্রনাথের কৃষি ভাবনার প্রশংসা নিয়ে লেখক দ্বিমত পোষণ করেছেন। তিনি মনে করেন, রবীন্দ্রনাথের কৃষি ভাবনা ছিল মূলত জমিদারী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আসা একটি 'রোমান্টিক মডেল', যা দীর্ঘমেয়াদে সফল হয়নি।
বাস্তবতা: বিপরীতে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কৃষি বিপ্লব ছিল মাঠপর্যায়ের এবং উৎপাদনমুখী, যা দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করেছিল। নিজের দলের সফল আদর্শ ছেড়ে কেন এই রবীন্দ্র-নির্ভরতা—সেই প্রশ্নটিই এখানে মুখ্য।
৩. ছাত্ররাজনীতি: নিষিদ্ধ নয়, প্রয়োজন কঠোর নিয়ন্ত্রণ
বর্তমানে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছাত্ররাজনীতি নিয়ে এক ধরনের ঘৃণা বা অনীহা (I Hate Politics) তৈরি হয়েছে। সহিংসতা, সিটবাণিজ্য এবং গেস্টরুম নির্যাতনের অভিজ্ঞতাই এর মূল কারণ। তবে সমাধান কি রাজনীতি নিষিদ্ধ করা?
সংস্কারের ডাক: লেখক মনে করেন, ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করা কোনো সুস্থ সমাধান নয়। কারণ ছাত্ররাই আগামীর নেতৃত্ব। বরং প্রয়োজন একটি সুনির্দিষ্ট 'Code of Conduct' বা আচরণবিধি।
বিকল্প প্রস্তাব:
ক্যাম্পাসে অস্ত্র ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে 'জিরো টলারেন্স'।
নিয়মিত ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন নিশ্চিত করা।
লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতির বদলে বুদ্ধিবৃত্তিক ও গবেষণানির্ভর রাজনীতি গড়ে তোলা।
উপসংহার
রাজনীতিতে জনসম্পৃক্ততা জরুরি, কিন্তু তা যেন নিরাপত্তার সীমা লঙ্ঘন না করে। একইভাবে ছাত্ররাজনীতিকে কলুষমুক্ত করতে হলে একে 'ক্যাডারভিত্তিক শক্তি' থেকে 'বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তি'তে রূপান্তর করতে হবে। একটি জাতি তখনই শক্তিশালী হয়, যখন তার তরুণ সমাজ সুস্থ ধারার রাজনীতি ও রাষ্ট্রচিন্তায় উদ্বুদ্ধ থাকে।
What's Your Reaction?
অনলাইন ডেস্কঃ