পাহাড়ের বুকে জুমের সোনালি সমারোহ: ফিরছে পাহাড়ি জনপদের জীবিকার আশা

সাথোয়াই অং মারমা, রোয়াংছড়ি প্রতিনিধি, বান্দরবানঃ
৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১১:১৯ এএম
শেয়ার করুন:
পাহাড়ের বুকে জুমের সোনালি সমারোহ: ফিরছে পাহাড়ি জনপদের জীবিকার আশা

ভোরের পাহাড়ি ঢালে কুয়াশার চাদর আর চারপাশের সবুজের সমারোহ। সেই সবুজের বুক চিরে এখন জেগে উঠেছে জুমের মাঠজুড়ে সোনালি ধানের শিষ। দীর্ঘদিনের ঘামঝরা পরিশ্রম ও প্রতীক্ষার পর বান্দরবানের পাহাড়ে পাহাড়ে শুরু হয়েছে জুমের ধান কাটার ব্যস্ততা। মাঠে মাঠে ফলন্ত সোনালি ফসল ঘরে তোলার আনন্দে পাহাড়ি জুমচাষিদের মুখে ফুটে উঠেছে স্বস্তি ও তৃপ্তির হাসি। 

পাহাড়ে জুমের ধান কেবল খাদ্যের সংস্থান নয়; এটি পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই ফসল তোলার এই মৌসুমে দুর্গম পাহাড়জুড়ে বইছে উৎসবের আমেজ।

স্থানীয় জুমচাষি মংক্যপ্রু মারমা ও মাথুইপ্রু মারমা বলেন, “আমাদের নিজস্ব কোনো সহায়-সম্বল নেই। বাপ-দাদার আমল থেকে যেভাবে জুম চাষ করে জীবিকা চলে আসছে, আমরাও সেটাই ধরে রেখেছি। অর্থাভাবে আমরা লেখাপড়া করতে পারিনি, তবে সন্তানদের শিক্ষিত করতে সাধ্যমতো চেষ্টা করে যাচ্ছি।” তারা জানান, প্রতি বছর জমি নির্বাচন, জঙ্গল ও আগাছা পরিষ্কার, পাহাড়ি ঢালে বীজ বোনা থেকে শুরু করে প্রতিকূল প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে ফসল ঘরে তোলা পর্যন্ত দিনরাত হাড়ভাঙা খাটুনি করতে হয়। এটি তাঁদের কাছে কেবল কৃষিকাজ নয়, টিকে থাকার মূল অবলম্বন।

সরেজমিনে রোয়াংছড়ির বিভিন্ন দুর্গম পাহাড়ি এলাকা ঘুরে দেখা যায়, আজও বহু পাহাড়ি পরিবার পুরোপুরি জুম চাষের ওপর নির্ভরশীল। বর্ষা আসার আগেই উপযুক্ত পাহাড়ি ঢাল নির্বাচন করে জুমের প্রস্তুতি শুরু হয়। গাছপালা ও আগাছা কেটে রোদে শুকানোর পর তাতে আগুন দিয়ে জমি পরিষ্কার ও প্রস্তুত করা হয়। এরপর সেই জমিতেই একসঙ্গে বোনা হয় ধান, ভুট্টা, মরিচ, তিল, ঢেঁড়স, শিম, মিষ্টি কুমড়া, হলুদ, আদাসহ নানা জাতের ফসল। জুম চাষের মূল বৈশিষ্ট্য হলো—একই জমিতে বহু ফসলের সহাবস্থান। ফলে কোনো একটি ফসলের ক্ষতি হলেও অন্য ফসল দিয়ে কৃষক তাঁর ঘাটতি পূরণ করতে পারেন। দুর্গমতার কারণে আধুনিক কৃষি উপকরণের সংকট থাকা সত্ত্বেও এ পদ্ধতি বহু বছর ধরে পাহাড়ি পরিবারের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করে আসছে।

জুমের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে পাহাড়ি মানুষের সামাজিক বন্ধনও। জমি প্রস্তুত থেকে শুরু করে ফসল তোলা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে পরিবার ছাড়াও পাড়া-প্রতিবেশী ও স্বজনদের পারস্পরিক সহযোগিতা লক্ষ্য করা যায়। ফলে জুম পাহাড়ি জনপদের পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির এক জীবন্ত প্রতীক।

তবে কালের পরিক্রমায় জুম চাষ এখন নানা সংকটের মুখোমুখি। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, চাষযোগ্য জমির সংকট, বনাঞ্চলের পরিবর্তন, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বাজারজাতকরণ সমস্যার কারণে চাষিরা ন্যায্য প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। যোগাযোগব্যবস্থা দুর্গম হওয়ায় উৎপাদিত পণ্য সদরের বাজারে নিয়ে যেতে কৃষকদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়।

সংশ্লিষ্টদের মতে, জুমচাষিদের আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তি, উন্নত বীজ, প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ এবং উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে পারলে জুম চাষ আরও বেশি লাভজনক ও টেকসই হয়ে উঠবে।

পাহাড়ের ঢালে জুমের প্রস্তুতি হয়তো ক্ষণিকের জন্য প্রকৃতিকে ধূসর করে দেয়, কিন্তু কয়েকমাস পরই সেই মাটিই ধারণ করে গাঢ় সবুজ ও সোনারঙা রূপ। সেই সোনালি ফসলের মাঝেই মিশে থাকে পাহাড়ি মানুষের হাজার বছরের শ্রম, স্বপ্ন আর প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হয়ে বেঁচে থাকার চিরন্তন গল্প।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।