বিহার থেকে মহারাষ্ট্রে মাদরাসায় পড়তে যাওয়া ১৬৩ শিশু কেন আটক হয়েছিল? ফিরে দেখা নেপথ্য ঘটনা
শিক্ষা লাভের উদ্দেশ্যে বিহার থেকে মহারাষ্ট্রের একটি মাদরাসায় যাচ্ছিল ১৬৩ জন শিশু-কিশোর। সঙ্গে ছিলেন আটজন শিক্ষক। কিন্তু যাত্রাপথে মধ্যপ্রদেশের কাটনি রেলওয়ে স্টেশনে তাদের গতিরোধ করে পুলিশ। পাচারের অভিযোগে দীর্ঘ সময় তাদের আটকে রাখা হয়। সম্প্রতি বিবিসি হিন্দির এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই ঘটনার নেপথ্যের করুণ চিত্র উঠে এসেছে।
ঘটনার সূত্রপাত
গত ১১ এপ্রিল পাটনা-পুনে এক্সপ্রেসে করে মহারাষ্ট্রের লাতুরে একটি মাদরাসায় যাচ্ছিল আরারিয়া ও সুপাউল জেলার এই শিক্ষার্থীরা। মধ্যপ্রদেশের কাটনি স্টেশনে চাইল্ড ওয়েলফেয়ার কমিটির সদস্য দুর্গেশ মারিয়ার এক লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে রেলওয়ে পুলিশ (জিআরপি) ও আরপিএফ তাদের ট্রেন থেকে নামিয়ে আনে। অভিযোগ ছিল, এই শিশুদের শ্রমিকের কাজের জন্য পাচার করা হচ্ছে।
পরিবারের আর্তনাদ ও পুলিশের দাবি
আটক হওয়া শিশুদের মধ্যে ১৪৪ জনই আরারিয়া জেলার বাসিন্দা। এদেরই একজন ৫৫ বছর বয়সী কিস্মতি। নিজের সন্তান ও নাতিকে ছাড়িয়ে আনতে কোনোদিন গ্রাম থেকে বের না হওয়া এই নারী পাড়ি দিয়েছেন ৯০০ কিলোমিটার পথ। তিনি জানান, তার সন্তানরা গত দুই বছর ধরে হাফেজ হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। তৃতীয় বছরে পা দেওয়ার আগেই তাদের চোর-পাচারকারীর মতো আটকে রাখা হয়।
যদিও পুলিশের দাবি, শিশুদের নিরাপত্তার স্বার্থেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। তবে মাদরাসা শিক্ষক সাদ্দাম জারজিস জানান, শিশুদের আধার কার্ড এবং গ্রামপ্রধানের প্রত্যয়নপত্রসহ প্রয়োজনীয় সব নথি তাদের কাছে ছিল। তবুও মুঘলসরাই স্টেশনে একবার ছাড় দিলেও কাটনিতে তাদের জোরপূর্বক আটকে রাখা হয় এবং 'জাগৃতি' নামক একটি দুই কামরার ঘিঞ্জি আবাসে কোনোমতে রাখা হয়।
তদন্ত ও আইনি জটিলতা
আরারিয়ার ‘জন জাগরণ শক্তি’ সংগঠনের আইনি সহায়তায় শিশুদের উদ্ধার প্রক্রিয়া শুরু হয়। আইনজীবী রামিজ রেজা অভিযোগ করেন, "পরিবারগুলোর সম্মতি এবং বৈধ কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও স্রেফ ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে তাদের হয়রানি করা হয়েছে।" যদিও শেষ পর্যন্ত কোনো পাচারের প্রমাণ পাওয়া যায়নি, তবুও ১৩ দিন পর্যন্ত ওই শিশুদের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন রাখা হয়েছিল।
কেন এই দূরযাত্রায় পাড়ি দেয় শিশুরা?
বিহারের সীমান্ত সংলগ্ন জেলাগুলো অর্থনৈতিক ও শিক্ষার দিক থেকে অত্যন্ত অনগ্রসর। নীতি আয়োগের তথ্যমতে, আরারিয়া ও পূর্ণিয়ার মতো জেলাগুলো অত্যন্ত দরিদ্র। স্থানীয়রা জানান, সরকারি স্কুলে পড়াশোনার মান ভালো নয় এবং বেসরকারি স্কুলে পড়ানোর সামর্থ্য তাদের নেই। অন্যদিকে, অন্য রাজ্যের বড় মাদরাসাগুলোতে থাকা-খাওয়া ও পড়াশোনা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পাওয়া যায়। মূলত চরম দারিদ্র্য এবং সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ার লক্ষ্যেই এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয় কোমলমতি শিশুরা।
অন্যত্রও একই চিত্র
শুধু মধ্যপ্রদেশেই নয়, ওড়িশার কটকেও একইভাবে বিহারের ৫৯ জন নাবালককে ট্রেন থেকে নামিয়ে চাইল্ড কেয়ার ক্যাম্পে রাখা হয়েছিল। তারা দীর্ঘ এক মাস পর বাড়িতে ফিরতে পেরেছেন।
উপসংহার
পরিবারগুলোর অভিযোগ, নিরাপত্তার নামে এই হয়রানি তাদের সন্তানদের শিক্ষার পথকে বাধাগ্রস্ত করছে। যদি স্থানীয় পর্যায়ে ভালো মানের মাদরাসা বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠত, তবে এই অভাবী শিশুদের হাজার মাইল দূরে গিয়ে এমন হয়রানির শিকার হতে হতো না। শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা ঘরে ফিরলেও তাদের মনে এক অজানা আতঙ্ক থেকেই গেছে।
What's Your Reaction?
অনলাইন ডেস্কঃ