শিকলবন্দি জীবনের ১৮ বছর: মাদারীপুরে বিনাচিকিৎসায় ধুঁকছেন বনলতা
শৈশবে আর দশটা সাধারণ শিশুর মতোই হাসি-খুশিতে বেড়ে উঠছিলেন বনলতা হালদার (৩৫)। পড়াশোনায় ছিলেন মেধাবী আর মনোযোগী। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে সেই চঞ্চল কিশোরী আজ দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে শিকলবন্দি। মাদারীপুরের ডাসার উপজেলার নবগ্রাম ইউনিয়নের নয়াকান্দি গ্রামে এক অমানবিক ও মানবেতর জীবন অতিবাহিত করছেন তিনি।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মৃত কার্তিক হালদারের মেয়ে বনলতা যখন অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী, তখন থেকেই তার মানসিক ভারসাম্যহীনতা প্রকাশ পেতে শুরু করে। সে সময় বাবা বেঁচে থাকায় সাধ্যমতো চিকিৎসা করালে তিনি কিছুটা সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু বাবার মৃত্যুর পর সংসারে নেমে আসে চরম দারিদ্র্যের কালো ছায়া। মা ও দুই ভাই অন্যের জমিতে কৃষিকাজ করে কোনোমতে জীবিকা নির্বাহ করেন। অর্থাভাবে বন্ধ হয়ে যায় বনলতার চিকিৎসা, আর তার পর থেকেই শুরু হয় তার বন্দিজীবন।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বাড়ির পাশে পুকুরপাড়ে একটি গাছের সঙ্গে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে বনলতাকে। রোদ-বৃষ্টি কিংবা ঝড়—প্রকৃতির সব প্রতিকূলতা সয়ে সেখানেই কাটে তার দিনরাত্রি। কখনো সকাল থেকে সন্ধ্যা, আবার কখনো সারারাত তাকে এভাবেই গাছের সঙ্গে বন্দি থাকতে হয়। দারিদ্র্যের কষাঘাতে নিয়মিত খাবারও জোটে না তার কপালে।
বনলতার বড় ভাই মিন্টু হালদার অত্যন্ত ভারাক্রান্ত কণ্ঠে বলেন, "আমার বোনের ১৮ বছর বয়স থেকে এই সমস্যা শুরু হয়। টাকার অভাবে উন্নত চিকিৎসা করাতে পারিনি। এখন সে প্রায় উন্মাদ। লোক দেখলেই গালিগালাজ করে, তাই বাধ্য হয়ে তাকে শিকলে বেঁধে রাখতে হয়। কোনো সহৃদয় ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এগিয়ে এলে হয়তো আমার বোনটা আবার সুস্থ জীবনে ফিরতে পারত।"
এ বিষয়ে নবগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান দুলাল তালুকদার জানান, পরিষদ থেকে তাকে প্রতিবন্ধী ভাতার কার্ড করে দেওয়া হয়েছে। তবে তাকে সুস্থ করতে হলে বড় ধরনের আর্থিক সহায়তা ও উন্নত চিকিৎসা প্রয়োজন।
ডাসার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জাকিয়া সুলতানা বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে বলেন, "বনলতা হালদারের মানবেতর জীবনযাপনের বিষয়টি আমরা অবগত হয়েছি। সমাজসেবা অফিস থেকে ইতোমধ্যে তাকে প্রতিবন্ধী কার্ড দেওয়া হয়েছে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আমরা নিয়মিত খোঁজ রাখছি। পরিবার চাইলে সরকারি ব্যবস্থাপনায় তাকে মানসিক হাসপাতালে ভর্তিসহ সব ধরনের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদান করা হবে।"
১৮টি বসন্ত পার হয়ে গেলেও বনলতার জীবনে ফেরেনি স্বাভাবিক ছন্দ। এখন দেখার বিষয়, সরকারি ও বেসরকারি সহযোগিতায় শিকল ছিঁড়ে বনলতা আবার কবে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারেন।
What's Your Reaction?
অনলাইন ডেস্কঃ