জেলা শহরে চালু হচ্ছে স্কুলবাস

অনলাইন ডেস্কঃ
২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১০:৪৮ এএম
শেয়ার করুন:
জেলা শহরে চালু হচ্ছে স্কুলবাস

শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও সুশৃঙ্খল যাতায়াত নিশ্চিত করতে দেশের বৃহৎ জেলা শহরগুলোতে স্কুলবাস চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে ১ হাজার ৬৭৪ কোটি টাকার একটি মেগা প্রকল্প হাতে নিয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)। ‘বৃহৎ জেলা শহরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গণপরিবহনভিত্তিক যাতায়াত ব্যবস্থা প্রকল্প’ শীর্ষক এ প্রস্তাবটি অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। 

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, প্রকল্পটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে শহরগুলোতে ব্যক্তিগত গাড়ি ও রিকশার ওপর নির্ভরতা কমবে, তীব্র যানজট নিরসন হবে এবং সাশ্রয়ী ভাড়ার কারণে অভিভাবকদের আর্থিক চাপ লাঘব হবে। তবে অতীতে রাজধানীতে স্কুলবাস চালুর উদ্যোগ ব্যর্থ হওয়ায় নতুন এ প্রকল্পের বাস্তবায়ন নিয়ে নানা চ্যালেঞ্জ ও প্রশ্নও রয়েছে।

পাইলট ভিত্তিতে ১৩টি শহরে চালু
পাঁচ বছর মেয়াদি এই প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল ধরা হয়েছে আগামী ১ জুলাই থেকে ২০৩২ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত। প্রাথমিক পর্যায়ে পাইলট প্রকল্প হিসেবে দেশের ১৩টি বড় নগর এলাকায় এটি চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে। শহরগুলো হলো—ঢাকা উত্তর, ঢাকা দক্ষিণ, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট, বরিশাল, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, রংপুর, ময়মনসিংহ ও বগুড়া।

খরচের খতিয়ান ও সম্ভাব্যতা যাচাই
প্রস্তাবিত ১ হাজার ৬৭৪ কোটি টাকা ব্যয়ের মধ্যে বড় অংশ অর্থাৎ ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকাই ব্যয় হবে মোটরযান বা স্কুলবাস ক্রয়ে। এছাড়া কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও প্রশাসনিক ব্যয় ধরা হয়েছে ১৫৯ কোটি টাকা, অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণে ২০ কোটি, কম্পিউটার সরঞ্জাম ক্রয়ে ৫১ কোটি এবং বিবিধ খাতে ৭৬ কোটি টাকা। 

এদিকে প্রকল্পটি চূড়ান্ত অনুমোদনের আগে এর কার্যকারিতা ও প্রয়োজনীয়তা খতিয়ে দেখতে ৩৩ কোটি টাকার একটি পৃথক সম্ভাব্যতা যাচাই প্রকল্পও পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে মাউশি। এর মাধ্যমে বিদ্যমান গণপরিবহন পরিস্থিতি, সড়ক পরিকাঠামো এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বাস্তব চাহিদা নিরূপণ করা হবে।

আধুনিক প্রযুক্তি ও ইলেকট্রিক বাস
প্রকল্পের নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, এই উদ্যোগে পরিবেশবান্ধব ‘ইলেকট্রিক স্কুলবাস’ ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, যা বায়ুদূষণ ও কার্বন নিঃসরণ কমাতে সাহায্য করবে। বাসগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় চার্জিং স্টেশনও স্থাপন করা হবে। 

পুরো পরিবহন ব্যবস্থাকে ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে যুক্ত থাকবে জিপিএস (GPS) ট্র্যাকিং, ডিজিটাল স্মার্টকার্ড এবং অনলাইন মনিটরিং ব্যবস্থা। এছাড়া যানজট এড়াতে আধুনিক জিআইএস (GIS) প্রযুক্তির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বাসস্থান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দূরত্ব বিশ্লেষণ করে রুট নির্ধারণ করা হবে। ভিড় কমাতে বিভিন্ন স্কুলের সময়সূচিতে সমন্বয় (School Time Staggering) করার পরিকল্পনাও রয়েছে। 

অতীতের ব্যর্থতার অভিজ্ঞতা ও সংশয়
শিক্ষার্থীদের জন্য গণপরিবহন চালুর উদ্যোগ দেশে এটিই প্রথম নয়। এর আগে ২০১০ সালে রাজধানীতে বিআরটিসির তত্ত্বাবধানে স্কুলবাস সেবা চালু করা হয়েছিল। তবে পর্যাপ্ত শিক্ষার্থীর অভাব এবং আকাশচুম্বী পরিচালনা ব্যয়ের কারণে অল্প সময়ের মধ্যেই তা মুখ থুবড়ে পড়ে। তৎকালীন তথ্যানুযায়ী, প্রতিটি বাসের দৈনিক পরিচালনা ব্যয় ছিল প্রায় ২ হাজার ৩০০ টাকা, অথচ আয় হতো মাত্র ২০০ টাকার মতো। লোকসানের ভারে একপর্যায়ে সেবাটি বন্ধ হয়ে যায়। একইভাবে গত বছর মাউশি ঢাকায় আবারও স্কুলবাস চালুর চেষ্টা করলেও সব স্কুলের ক্লাস শুরুর সময় একই থাকায় তা সফল হয়নি।

সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য
মাউশির সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. মুহম্মদ আজাদ খান এ উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও জেলা শহরের বাস্তবতায় কিছু সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেন, “পরিকল্পনামতো বাস্তবায়ন করা গেলে ভালো ফল পাওয়া সম্ভব। তবে জেলা শহরগুলোতে সরু রাস্তা, ট্রাফিক অব্যবস্থা ও যাত্রী সংকটের মতো নানা প্রতিকূলতা দেখা দিতে পারে। তাই মাঠপর্যায়ের বাস্তব গবেষণার পরই চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।”

মাউশির পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ড. মীর জাহীদা নাজনীন জানান, উদ্যোগটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পরই প্রকল্পটির চূড়ান্ত রূপরেখা ও কার্যকারিতা স্পষ্ট হবে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।