পেটের দায়ে থামল শৈশব: শিক্ষকের দেওয়া ১০ টাকার দুল স্মৃতিতে নিয়ে ঢাকার পথে কেয়া-আয়শা

মোঃ শাহ্ জালাল, স্টাফ রিপোর্টার:
২১ আগস্ট, ২০২৬ ১১:৪২ পিএম
শেয়ার করুন:
পেটের দায়ে থামল শৈশব: শিক্ষকের দেওয়া ১০ টাকার দুল স্মৃতিতে নিয়ে ঢাকার পথে কেয়া-আয়শা

পেটের দায়ে স্বপ্ন, শৈশব আর ক্লাসরুমকে পেছনে ফেলে মায়ের হাত ধরে ঢাকার পথে পাড়ি জমিয়েছে দুই বোন—পঞ্চম শ্রেণির কেয়া ও তৃতীয় শ্রেণির আয়শা। কোনো আনুষ্ঠানিক বিদায় নেই, নেই সহপাঠীদের শেষবারের মতো জড়িয়ে ধরার সুযোগ; ফরিদপুরের বড় কাজুলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এই দুই শিক্ষার্থীর হঠাৎ এভাবে হারিয়ে যাওয়ায় বিষণ্নতার ছায়া নেমে এসেছে বিদ্যালয়জুড়ে।

বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, অভাব-অনটন নিত্যসঙ্গী হলেও কেয়া ও আয়শা নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসত। অনেক দিন তারা আধপেটে কিংবা না খেয়েই ক্লাসে বসেছে। শত প্রতিকূলতার মধ্যেও দুই বোন পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করছিল। কিন্তু পরিবারের একমাত্র ভরসা মায়ের পক্ষে আর সংসারের ব্যয়ভার ও সন্তানদের দু’বেলা আহারের জোগাড় করা সম্ভব হচ্ছিল না। কোনো উপায় না পেয়ে শেষ পর্যন্ত দুই মেয়েকে নিয়ে কাজের খোঁজে রাজধানীতে চলে যাওয়ার কঠিন সিদ্ধান্ত নেন তাদের মা।

বিদায় নেওয়ার সময় বিদ্যালয় থেকে ছাড়পত্র (টিসি) নেওয়ার সুযোগটুকুও হয়নি তাদের। অভাবের তাড়নায় নীরবেই বন্ধ হয়ে গেল দুটি সম্ভাবনাময় জীবনের শিক্ষার পথ। 

কেয়ার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোঃ মিজান মুকুলের এক আবেগঘন স্মৃতি। কিছুদিন আগে বড় কাজুলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বালিকা ফুটবল দল উপজেলা পর্যায়ের সেমিফাইনালে অংশ নিয়েছিল। সেই খেলায় শিক্ষার্থীদের উৎসাহ দিতে প্রধান শিক্ষক কক্সবাজার থেকে তাদের জন্য উপহার হিসেবে কানের দুল ও ব্রেসলেট এনে দেন। সেই উপহারের মাত্র ১০ টাকা দামের একটি কানের দুল হারিয়ে ফেলে কান্নায় ভেঙে পড়েছিল কেয়া। সেই সামান্য উপহারটি কোনো মহার্ঘ বস্তু ছিল না, তবে শিক্ষকের দেওয়া ভালোবাসার স্মারক হিসেবে কেয়ার কাছে তা ছিল অমূল্য। আজ সেই কেয়াই নেই স্কুলে, নেই তার ছোট বোন আয়শাও। যে শ্রেণিকক্ষে তাদের কোলাহল ছিল, সেখানে আজ কেবলই শূন্যতা।

প্রধান শিক্ষক মোঃ মিজান মুকুল আক্ষেপ করে বলেন, “কেয়া ও আয়শা পড়াশোনায় বেশ ভালো ছিল। তাদের পারিবারিক সংকট আমাদেরও ভীষণভাবে পীড়িত করেছে। আমরা চেয়েছিলাম ওরা পড়াশোনা চালিয়ে যাক। কিন্তু যে পরিবারে দু’মুঠো খাবারের নিশ্চয়তা নেই, সেখানে কেবল পড়াশোনার কথা বলে শিশুদের ধরে রাখা আমাদের পক্ষেও সম্ভব হয়নি।”

স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, কেয়া ও আয়শার এই ঘটনা বিচ্ছিন্ন কোনো গল্প নয়; এটি দারিদ্র্যের নির্মম বাস্তবতায় দেশের হাজারো শিশুর শিক্ষাজীবন থেকে ঝরে পড়ার এক করুণ প্রতিচ্ছবি। দু’বেলা ভাতের নিশ্চয়তা পেতে গিয়ে যেন কোনো শিশুকে তার শিক্ষার মৌলিক অধিকার ও শৈশব বিসর্জন দিতে না হয়, সেজন্য সরকারি ও সামাজিক নিরাপত্তা উদ্যোগ আরও জোরদার করা জরুরি।

শিক্ষক ও সহপাঠীদের প্রত্যাশা—সমাজের কোনো সহৃদয় ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় কেয়া ও আয়শা হয়তো আবার ফিরে আসবে তাদের প্রিয় বিদ্যালয়ে। শিক্ষকের দেওয়া সেই ১০ টাকার কানের দুলের মতোই অমূল্য হয়ে টিকে থাকবে তাদের পড়াশোনার স্বপ্ন।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।