পৌর চেয়ারম্যান থেকে রাষ্ট্রপতি

অনলাইন ডেস্কঃ
২১ আগস্ট, ২০২৬ ১০:২৭ পিএম
শেয়ার করুন:
পৌর চেয়ারম্যান থেকে রাষ্ট্রপতি

বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেছেন অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। শুক্রবার সন্ধ্যায় বঙ্গভবনের দরবার হলে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তাঁকে শপথবাক্য পাঠ করান ভারপ্রাপ্ত স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। 

এর আগে জাতীয় সংসদ সদস্যদের ভোটে তিনি দেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে তৃণমূল থেকে উঠে আসা এই পরিচ্ছন্ন রাজনীতিক আগামী পাঁচ বছরের জন্য রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদের দায়িত্ব নিলেন। উল্লেখ্য, ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর শূন্য হওয়া পদে চলতি মাসের শুরুতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে বিএনপি তাদের দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দেয়।

শিক্ষকতা থেকে রাজনীতির ময়দানে

১৯৬০-এর দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নে যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাজনৈতিক জীবনের সূচনা হয়। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এস এম হল ইউনিটের সাধারণ সম্পাদক এবং ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিটের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। সে সময় তাঁকে কারাবরণও করতে হয়েছিল।

শিক্ষা জীবন শেষে ১৯৭২ সালে বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে উত্তীর্ণ হয়ে তিনি ঢাকা কলেজের অর্থনীতি বিভাগে প্রভাষক পদে যোগ দেন। শিক্ষকতা পেশা শেষে ১৯৭৯ সালে তৎকালীন উপ-প্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর একান্ত সচিব (পিএস) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে ১৯৮৬ সালে মওলানা ভাসানীর ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিতে (ন্যাপ) যোগদানের মাধ্যমে সরাসরি জাতীয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। এর দুই বছর পর, ১৯৮৮ সালে তিনি ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।

১৯৯০ সালে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় মির্জা ফখরুল বিএনপিতে যোগ দেন। ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে চারদলীয় জোট সরকারের মন্ত্রিসভায় প্রথমে কৃষি প্রতিমন্ত্রী এবং পরবর্তীতে বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।

প্রতিকূল সময়ে বিএনপির কাণ্ডারি

২০০৬ পরবর্তী সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং বিগত দেড় দশকের কঠিন সময়ে বিএনপির জন্য কাণ্ডারি হিসেবে আবির্ভূত হন মির্জা ফখরুল। 

২০০৯: বিএনপির জাতীয় কাউন্সিলে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব নির্বাচিত হন।
২০১১: তৎকালীন মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর তিনি ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পান।
২০১৬: দলটির পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার কারাবাস এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্বাসিত জীবনে দলের ওপর যখন নানামুখী চাপ ও দমন-পীড়ন চলছিল, তখন দেশের ভেতরে থেকে দলকে ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা করে নেতৃত্ব দেন তিনি। এই দীর্ঘ সময়ে আন্দোলন-সংগ্রাম করতে গিয়ে তাঁকে একাধিকবার কারাবরণ ও রাজনৈতিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে।

পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি ও রাজনৈতিক মূল্যায়ন

রাজনৈতিক অঙ্গনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অত্যন্ত মার্জিত, বিনয়ী ও সদালাপী রাজনীতিক হিসেবে পরিচিত। অন্য রাজনৈতিক দলের প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং আক্রমণাত্মক বক্তব্য পরিহারের কারণে দল-মত নির্বিশেষে তাঁর একটি ইতিবাচক ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি গড়ে উঠেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদের মতে, প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও নীতিতে অবিচল থাকা এবং পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির কারণেই মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার যোগ্য হয়ে উঠেছেন। বিশ্লেষকদের প্রত্যাশা, দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে তিনি এখন পুরো রাষ্ট্রের নিরপেক্ষ অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।

জন্ম ও পারিবারিক পরিচিতি

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন প্রখ্যাত আইনজীবী ও সাবেক সংসদ সদস্য। 

তিনি ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ছাত্রজীবনে তিনি নাট্যমঞ্চ ও আবৃত্তির মতো সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও যুক্ত ছিলেন।

ব্যক্তিগত জীবনে তাঁর স্ত্রী রাহাত আরা বেগম একটি বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। এই দম্পতির দুই মেয়ে—মির্জা শামারুহ ও মির্জা সাফারু। বড় মেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক ও বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় পোস্ট-ডক্টরাল ফেলো এবং ছোট মেয়ে একটি বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত। মির্জা ফখরুলের ছোট ভাই মির্জা ফয়সাল আমিনও ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।