ভারত-চীন সীমান্তে ফের উত্তেজনা

অনলাইন ডেস্কঃ
১৮ আগস্ট, ২০২৬ ১:১৯ পিএম
শেয়ার করুন:
ভারত-চীন সীমান্তে ফের উত্তেজনা

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য অরুণাচল প্রদেশে চীনের বিরুদ্ধে নতুন করে জমি দখলের অভিযোগ উঠেছে। এতে দুই পারমাণবিক শক্তিধর প্রতিবেশীর মধ্যে আবারও সীমান্ত উত্তেজনা বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। 

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অরুণাচল প্রদেশের ক্ষমতাসীন বিজেপির মিত্র দল ‘পিপলস পার্টি অব অরুণাচল’ (পিপিএ)-এর একটি তথ্য অনুসন্ধানী দল সম্প্রতি দুর্গম আপার সুবানসিরি জেলার তাকসিং এলাকা পরিদর্শন করে। ফিরে এসে দলটির দাবি, সীমান্তের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পয়েন্টে ভারতীয় সেনাদের নিয়মিত টহলে বাধা সৃষ্টি করছে চীনা বাহিনী এবং সেখানে তারা স্থায়ী উপস্থিতি বজায় রাখছে। এই অভিযোগের পর নয়াদিল্লিতে রাজনৈতিক অঙ্গন উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে এবং বিরোধীরা সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

অনুসন্ধানী দলের অভিযোগ ও স্থানীয়দের ক্ষোভ
পিপিএ-এর চার সদস্যের দলটির দাবি, ভৌগোলিক ও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ভারী বৃষ্টিপাত, বন্যা ও ভূমিধসের ফলে ওই এলাকায় ভারতীয় সেনাদের টহল কার্যক্রম ব্যাহত হয়। তবে প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও সীমান্ত এলাকায় চীনা পিপলস লিবারেশন আর্মি (পিএলএ) সক্রিয় রয়েছে, যা ভারতের সীমান্ত অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাকে স্পষ্ট করে তোলে। 

প্রতিবেদনে স্থানীয়দের বরাত দিয়ে আরও দাবি করা হয়, ২০২৩ সালে পিএলএ-এর সঙ্গে সংঘাতের পর ভারতীয় সেনারা ‘শেরা-৫’ নামের একটি সীমান্ত টহল চৌকি ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিল। পিপিএ-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট কালিং জেরাং জানান, চীনা অনুপ্রবেশের ফলে স্থানীয় বাসিন্দারা তাদের পূর্বপুরুষদের শিকারের জায়গা হারিয়ে ক্ষুব্ধ। এর আগে স্থানীয় আদিবাসী সংগঠন ‘নাহ ওয়েলফেয়ার সোসাইটি’ও প্রশাসনের কাছে একই অভিযোগ জানিয়েছিল।

সামরিক ও কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়া
ভারতীয় সেনাবাহিনী অবশ্য অনুপ্রবেশের এই দাবি সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেছে। এক বিবৃতিতে সেনা কর্তৃপক্ষ একে ‘ভুল ও ভিত্তিহীন’ বলে আখ্যা দেয়। 

তবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিষয়টি পুরোপুরি উড়িয়ে দেয়নি। মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানান, ভারত সীমান্ত পরিস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে এবং শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা তাদের অগ্রাধিকার। 

অন্যদিকে, চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুয়ো জিয়াকুন দাবি করেন, বর্তমানে সীমান্ত পরিস্থিতি সার্বিকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, সম্প্রতি দুই দেশের মধ্যে সীমান্তবিষয়ক ৩৬তম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে, যেখানে উভয় পক্ষই কূটনৈতিক ও সামরিক যোগাযোগ বজায় রাখতে সম্মত হয়েছে।

দীর্ঘদিনের সীমান্ত বিরোধ ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
ভারত ও চীনের মধ্যে প্রায় ৩ হাজার ৪৮৮ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে, যার বড় অংশই অচিহ্নিত ও বিতর্কিত। ১৯১৪ সালের সিমলা কনভেনশনের ‘ম্যাকমোহন লাইন’-কে ভারত আনুষ্ঠানিক সীমান্ত মানলেও চীন তা প্রত্যাখ্যান করে অরুণাচল প্রদেশকে ‘দক্ষিণ তিব্বত’ বলে দাবি করে আসছে। 

১৯৬২ সালের যুদ্ধের পর দুই দেশ ‘প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা’ (এলএসি) মেনে নিলেও এর সুনির্দিষ্ট অবস্থান নিয়ে মতপার্থক্য কাটেনি। ফলে ২০২০ সালে লাদাখের গালওয়ান উপত্যকায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের মতো ঘটনা ঘটে, যেখানে ২০ জন ভারতীয় এবং ৪ জন চীনা সেনা নিহত হন। এছাড়া সিকিমের নাকু লা এবং ভুটান-চীন-ভারত সংযোগস্থল ডোকলামেও অতীতে দুই দেশের মধ্যে তীব্র মুখোমুখি অবস্থান তৈরি হয়েছিল।

বাণিজ্য বাড়লেও কাটেনি কৌশলগত দ্বন্দ্ব
সীমান্তে রাজনৈতিক ও কৌশলগত টানাপোড়েন থাকলেও দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভারত-চীন পণ্য বাণিজ্য দাঁড়িয়েছে ১৫১ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারে। তবে বাণিজ্যের বড় অংশই চীনের অনুকূলে—যেখানে ভারতের আমদানি ১৩১ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলার এবং রপ্তানি মাত্র ১৯ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন ডলার।

বিশ্লেষকদের মতে, বাণিজ্য বাড়লেও সীমান্ত বিরোধের স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় দুই দেশের সম্পর্ক এখনও ‘নিয়ন্ত্রিত প্রতিযোগিতা’র বৃত্তেই বন্দি। অরুণাচল সীমান্তে ছোট কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাও যে কোনো সময় গালওয়ানের মতো বড় সংঘাতে রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।