কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে খুনের পর অর্ধশত বাড়িতে তাণ্ডব ও লুটপাট, এলাকা পুরুষশূন্য

দৌলতপুর প্রতিনিধিঃ মোঃ হারুন অর রশীদ
৩ অক্টোবর, ২০২৬ ৬:৫২ পিএম
শেয়ার করুন:
কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে খুনের পর অর্ধশত বাড়িতে তাণ্ডব ও লুটপাট, এলাকা পুরুষশূন্য

কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের দুর্গম চরাঞ্চল চড়ইকুড়ি মরারচরে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও এক ব্যক্তি নিহত হওয়ার ঘটনাকে পুঁজি করে প্রতিপক্ষের অর্ধশত বাড়িতে নজিরবিহীন হামলা ও লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। হামলা ও পুলিশের গ্রেপ্তার এড়াতে পুরো এলাকা এখন কার্যত পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে। চরাঞ্চলের নিস্তব্ধ জনপদে এখন শুধুই নারী ও শিশুদের চাপা কান্না আর অজানা আতঙ্ক।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত বৃহস্পতিবার বিকেলে মরারচর এলাকায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে ‘পটল গ্রুপ’ ও ‘আজাদ বিশ্বাস গ্রুপ’-এর মধ্যে প্রায় ঘণ্টাব্যাপী রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষে পটল গ্রুপের প্রধান পটলের আপন ভাই গোলাম মোস্তফা ওরফে ট্যাংগর (৬০) নিহত হন। 

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, এই হত্যাকাণ্ডের পরই প্রতিপক্ষ আজাদ বিশ্বাস গ্রুপের ওপর প্রতিশোধ নিতে মরিয়া হয়ে ওঠে পটল গ্রুপের লোকজন। স্থানীয় আইয়ুব মেম্বার, পটল ও তার ছেলে মাসুম, রাজ্জাক এবং শাহ জামালের নেতৃত্বে ৩০ থেকে ৪০ জনের একটি সশস্ত্র দল আজাদ বিশ্বাস, টনি বিশ্বাস, ডন বিশ্বাস, নায়েব মণ্ডল, কাজল বিশ্বাস ও রাজ্জাক বিশ্বাসসহ এলাকার অন্তত ৫০টি বাড়িতে একযোগে তাণ্ডব চালায়। লুটপাটের সময় বাধা দিতে গেলে বাড়ির নারীদের ওপরও নির্যাতন চালানো হয়। 

ভুক্তভোগীরা জানান, হামলাকারীরা বৃহস্পতিবার তাণ্ডব চালিয়েও ক্ষান্ত হয়নি। পরদিন শুক্রবার দিন ও রাতে দফায় দফায় মরারচর ও নিচপাড়া এলাকায় নতুন করে হামলা চালানো হয়। এ সময় নারীদের জিম্মি করে ১০টি মোটরসাইকেল, প্রায় ১৮ লাখ টাকা নগদ, ৪০ ভরি স্বর্ণালংকার, ২০টি গরু, ৪০টি ছাগল, ৩০টি ভেড়াসহ আসবাবপত্র, চাল-ডাল এবং রান্নার গ্যাস সিলিন্ডার পর্যন্ত লুট করে নেওয়া হয়। ক্ষতিগ্রস্তদের দাবি, সব মিলিয়ে প্রায় দুই কোটি টাকার মালামাল লুট করা হয়েছে। 

ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্য টনি বিশ্বাস ও নায়েব মণ্ডল অভিযোগ করে বলেন, "লুটপাটের হাত থেকে রক্ষা পেতে থানা পুলিশ ও বিজিবির কাছে আবেদন জানিয়েও কোনো প্রতিকার মিলছে না। উল্টো শনিবারও পটলের ছেলে মাসুম দলবল নিয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে নতুন করে হুমকি দিয়ে আসছে।" 

এদিকে সংঘর্ষ ও লুটপাটের ঘটনার পর থেকে চড়ইকুড়ি মরারচর, নতুনপাড়া ও নিচপাড়া এলাকা পুরোপুরি পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে। আহতরা গ্রেপ্তার এড়াতে গোপনে দূর-দূরান্তে চিকিৎসা নিচ্ছেন। চরম নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছেন ফেলে আসা পরিবারের নারী ও শিশুরা। অবিলম্বে লুটপাটের সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন চরাঞ্চলের সাধারণ মানুষ।

রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. সিরাজুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, "মরারচরে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে সংঘর্ষে ট্যাংগর নামে একজন নিহত হয়েছেন। তবে এই হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে পটল ও তার ছেলে মাসুমের নেতৃত্বে ২৫-৩০ জন দুর্বৃত্ত প্রায় ৫০টি বাড়িতে লুটপাট চালিয়েছে। তারা গরু, মহিষ, ছাগল থেকে শুরু করে রান্নার থালাবাসন পর্যন্ত নিয়ে গেছে।"

এ বিষয়ে দৌলতপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) খালেদুর রহমান জানান, "চরাঞ্চলে সংঘর্ষে গোলাম মোস্তফা ট্যাংগর নিহত হওয়ার ঘটনায় থানায় হত্যা মামলা দায়ের হয়েছে। এজাহারভুক্ত আসামি শাহজামালকে ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।" 

তবে বড় ধরনের লুটপাটের অভিযোগ অস্বীকার করে ওসি বলেন, "সংঘর্ষের সুযোগে এক জোড়া গরু নিয়ে যাওয়ার সময় টহলরত বিজিবি সদস্যরা তা জব্দ করে ক্যাম্পে রেখেছেন। এলাকায় শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পুলিশ তৎপর রয়েছে।"

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।