কালকিনিতে শিক্ষার্থীশূন্য বালিকা বিদ্যালয়: প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ

আলমাস বেপারী, কালকিনি প্রতিনিধি, মাদারীপুরঃ
৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৫:২১ পিএম
শেয়ার করুন:
কালকিনিতে শিক্ষার্থীশূন্য বালিকা বিদ্যালয়: প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ

সুপরিসর খেলার মাঠ, পাকা ভবন আর প্রয়োজনীয় শিক্ষক—সবই আছে। অথচ শ্রেণিকক্ষে নেই কোনো শিক্ষার্থী। সারি সারি খালি বেঞ্চ পড়ে আছে ধুলোবালির আস্তরণ মেখে। যে বিদ্যালয়ে একসময় শত শত ছাত্রীর পদচারণায় মুখর থাকত প্রাঙ্গণ, সেখানে এখন কেবলই সুনসান নীরবতা। 

এটি মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার রমজানপুর ইউনিয়নের জজিরা গ্রামে ১৯৫৩ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘জজিরা নিম্ন মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়’-এর বর্তমান চিত্র। প্রায় সাত দশকের পুরোনো ঐতিহ্যবাহী এই প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা কমিটির অনুপস্থিতি, নানা অনিয়ম এবং প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে ওঠা গুরুতর অভিযোগের কারণে আজ শিক্ষার্থীশূন্য হয়ে পড়ার উপক্রম হয়েছে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদানের অনুমতি থাকা এই বিদ্যালয়ে কোনো শ্রেণিকক্ষেই পাঠদান চলছে না। বাস্তবে কোনো শিক্ষার্থীর দেখা না মিললেও অভিযোগ রয়েছে, কাগজ-কলমে সরকারি খাতাপত্রে নিয়মিত শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি দেখানো হচ্ছে।

বিদ্যালয়টির এমন বেহাল দশার পেছনে প্রধান শিক্ষক আবদুল্লাহ আল মাহমুদ (হিরু মাস্টার)-এর বিরুদ্ধে ওঠা নানা অনিয়মকে দায়ী করছেন স্থানীয়রা। তাদের অভিযোগ, প্রধান শিক্ষক নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসেন না। মাসে দু-এক দিন এসে পুরো মাসের হাজিরা খাতায় অগ্রিম স্বাক্ষর করে চলে যান। এছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে শূন্য পদে চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে একাধিক ব্যক্তির কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানে কোনো ম্যানেজিং কমিটি না থাকায় প্রশাসনিক নজরদারিও পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে।

স্থানীয় ইউপি সদস্য আবদুল সালেক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “শিক্ষকরা ঠিকমতো পাঠদান না করায় অভিভাবকরা বাধ্য হয়ে সন্তানদের অন্যত্র ভর্তি করাচ্ছেন। প্রধান শিক্ষকের অনিয়ম-দুর্নীতির শেষ নেই। তাঁর বিরুদ্ধে কথা বললেও তিনি ওপর মহলের প্রভাব খাটিয়ে সব ধামাচাপা দেন। ফলে প্রতিষ্ঠানটি আজ ধ্বংসের মুখে।”

চাকরি দেওয়ার নামে অর্থ আত্মসাতের শিকার অভিযোগকারী রিপন ভূঁইয়া বলেন, “চতুর্থ শ্রেণির শূন্য পদে চাকরি দেওয়ার কথা বলে প্রধান শিক্ষক আমার কাছ থেকে টাকা নিয়েছেন। একইভাবে আরও কয়েকজনের কাছ থেকেও অর্থ নেওয়া হয়েছে। এখন চাকরিও দিচ্ছেন না, টাকাও ফেরত দিচ্ছেন না। তিনি নিজেই ঠিকমতো স্কুলে আসেন না, মাসে এক দিন এসেই দায় সারেন।”

তবে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন প্রধান শিক্ষক আবদুল্লাহ আল মাহমুদ (হিরু মাস্টার)। অর্থ লেনদেনের অভিযোগকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন দাবি করে তিনি বলেন, “স্থানীয় একটি পক্ষের সঙ্গে আমার বিরোধ রয়েছে। তারা বিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তন করতে চেয়েছিল, আমি তাতে রাজি না হওয়ায় একটি চক্র আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অপপ্রচার চালাচ্ছে। স্থানীয় সেই দ্বন্দ্বের কারণেই অভিভাবকরা শিক্ষার্থী পাঠানো কমিয়ে দিয়েছেন, এর জন্য আমি এককভাবে দায়ী নই।”

বিদ্যালয়টির এ অচলাবস্থার বিষয়ে কালকিনি উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আশ্রাফুজ্জামান জানান, “জজিরা নিম্ন মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের সার্বিক পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। তদন্ত শেষে প্রতিবেদন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) মাধ্যমে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশ অনুযায়ী দ্রুতই প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

এদিকে দ্রুত তদন্তের সঠিক বাস্তবায়ন, নিয়মিত পাঠদান নিশ্চিত করা এবং যোগ্য শিক্ষকদের পদায়নের মাধ্যমে ঐতিহ্যবাহী এই বিদ্যাপীঠটিকে আবারও প্রাণবন্ত করে তোলার জোর দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।