ল্যানসেটে বাংলাদেশি চিকিৎসকের গবেষণা প্রকাশ, সুবিধা পাবেন দেশের মানুষ

অনলাইন ডেস্কঃ
৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৪:৪৩ পিএম
শেয়ার করুন:
ল্যানসেটে বাংলাদেশি চিকিৎসকের গবেষণা প্রকাশ, সুবিধা পাবেন দেশের মানুষ

রক্তে একটি সাধারণ মার্কার পরীক্ষার মাধ্যমে ‘সেপসিস’ বা রক্তে বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের সময়কাল প্রায় অর্ধেকে নামিয়ে আনা সম্ভব। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চিকিৎসা সাময়িকী ‘দ্য ল্যানসেট’-এর সহযোগী জার্নাল ‘ই-ক্লিনিক্যাল মেডিসিন’-এ প্রকাশিত এক যুগান্তকারী গবেষণায় এই তথ্য উঠে এসেছে। 

বাংলাদেশের একটি সরকারি হাসপাতালে পরিচালিত এই ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে নেতৃত্ব দিয়েছেন বাংলাদেশি চিকিৎসক ও গবেষক ডা. ফরহাদ উদ্দিন হাসান চৌধুরী।

গত ৩ সেপ্টেম্বর ল্যানসেটে ‘প্রোক্যালবান’ (Procal-Ban) শিরোনামে গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়। যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়, ওয়েলকাম ট্রাস্ট এবং কমনওয়েলথ স্কলারশিপ কমিশনের সহায়তায় ৫৭ সদস্যের একটি গবেষক দল এই বিস্তৃত গবেষণাটি সম্পন্ন করে।

গবেষণার মূল ফলাফল
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে ২০২৩–২৪ সালে ভর্তি হওয়া সেপসিস রোগীদের মধ্য থেকে ৫৩২ জনকে নিয়ে দৈবচয়ন ভিত্তিতে এই গবেষণাটি পরিচালিত হয়। রোগীদের দুটি দলে ভাগ করে দেখা যায়:
প্রচলিত চিকিৎসা পদ্ধতি: যে দলটিকে প্রচলিত নিয়মে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে, তাদের অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের মধ্যম সময় ছিল ৯ দিন।
পরীক্ষাভিত্তিক চিকিৎসা: রক্তে ‘প্রোক্যালসিটোনিন’ (Procalcitonin) মার্কার পর্যবেক্ষণ করে চিকিৎসা দেওয়া রোগীদের অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের মধ্যম সময় নেমে এসেছে মাত্র **৪ দশমিক ৭ দিনে।

গবেষকেরা নিশ্চিত করেছেন, অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার অর্ধেক কমালেও রোগীদের আরোগ্য লাভ, পুনরায় সংক্রমণ কিংবা মৃত্যুহারের ক্ষেত্রে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি।

সেপসিস ও অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধের ঝুঁকি
সেপসিস হলো রক্তে এমন এক তীব্র সংক্রমণ, যার ফলে শরীরের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা অতিরিক্ত সক্রিয় হয়ে নিজেরই বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিকল করতে শুরু করে। বাংলাদেশে সেপসিসে আক্রান্ত রোগীদের দীর্ঘ সময় অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া সাধারণ বিষয়। 

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রয়োজনের অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে যেমন মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দেয়, তেমনি জীবাণুগুলো ‘অ্যান্টিবায়োটিক-রেজিস্ট্যান্ট’ (প্রতিরোধী) হয়ে ওঠার আশঙ্কা তৈরি হয়। এটি বর্তমান চিকিৎসা বিজ্ঞানের অন্যতম বড় বৈশ্বিক সংকট।

সাধারণ মানুষের প্রাপ্তি ও নীতি-নির্ধারণের গুরুত্ব
গবেষণার প্রধান ডা. ফরহাদ উদ্দিন হাসান চৌধুরী জানান, ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণে রক্তে প্রোক্যালসিটোনিনের মাত্রা বাড়ে এবং সংক্রমণ কমলে তা দ্রুত হ্রাস পায়। এই মার্কার নিয়মিত পরীক্ষা করে চিকিৎসকেরা নির্ভুলভাবে বুঝতে পারেন ঠিক কখন অ্যান্টিবায়োটিক বন্ধ করা নিরাপদ।

বাংলাদেশে এই পরীক্ষার সুযোগ এখনো সীমিত ও ব্যয়বহুল। তবে ডা. ফরহাদ বলেন, "আমাদের গবেষণায় নিজস্ব প্রযুক্তির ব্যবহারে প্রতিবার এই পরীক্ষার খরচ প্রায় চার ডলারে (বর্তমান মূল্যে ৫০০ টাকার কাছাকাছি) নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। সরকারি পর্যায়ে উদ্যোগ নিলে জেলা-উপজেলা পর্যায়ের রোগীরাও স্বল্প খরচে এই সুফল পাবেন। এতে রোগীদের চিকিৎসার ব্যয় কমবে এবং দেশের স্বাস্থ্য খাতে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের ঝুঁকি বহুলাংশে হ্রাস পাবে।"

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই গবেষণার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ শুধু বিদেশি গবেষণার তথ্য সংগ্রহের জায়গা নয়; বরং সঠিক সুযোগ পেলে দেশের স্বাস্থ্য সমস্যার উদ্ভাবনী ও প্রমাণভিত্তিক সমাধান দিয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরে নেতৃত্ব দিতেও সক্ষম।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।