প্রক্রিয়াজাত ৩১ পণ্যে পাওয়া গেছে ভারী ধাতু

অনলাইন ডেস্কঃ
৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১:৪৯ পিএম
শেয়ার করুন:
প্রক্রিয়াজাত ৩১ পণ্যে পাওয়া গেছে ভারী ধাতু

দেশের বাজারে বহুল প্রচলিত ও জনপ্রিয় প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যের প্রায় সবকটিতেই মিলেছে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর বিভিন্ন ভারী ধাতুর উপস্থিতি। সম্প্রতি প্রকাশিত এক যৌথ গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরীক্ষা করা ৩২টি খাদ্যপণ্যের মধ্যে ৩১টিতেই নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে বেশি ভারী ধাতু পাওয়া গেছে। এর ফলে প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় শিশুরা মারাত্মক অ-ক্যানসারজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে।

‘জার্নাল অব ফুড কম্পোজিশন অ্যান্ড অ্যানালাইসিস’-এ গত ২২ আগস্ট প্রকাশিত এক গবেষণা নিবন্ধে এসব তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণাটির শিরোনাম ছিল *‘অ্যাসেসমেন্ট অব হেভি মেটাল কন্টামিনেশন অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটেড নন-কার্সিনোজেনিক অ্যান্ড কার্সিনোজেনিক হেলথ রিস্কস ইন প্রসেসড ফুডস ফ্রম বাংলাদেশ’*।

যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (যবিপ্রবি), ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি এবং অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব উলংগংয়ের গবেষকদের যৌথ উদ্যোগে এ গবেষণা পরিচালিত হয়।

ঝুঁকিতে শিশুরা

গবেষণা অনুযায়ী, ভারী ধাতু থাকা ৩১টি পণ্যের কারণে শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি নির্ধারিত সহনশীল মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি। প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি রয়েছে ৯টি পণ্যে। 

গবেষকরা জানান, প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় শিশুদের শারীরিক ওজন কম হওয়ায় একই পরিমাণ খাবার গ্রহণ করলেও তাদের শরীরের ওজনের তুলনায় বিষাক্ত ধাতুর প্রভাব অনেক বেশি পড়ে। ফলে শিশুরা সবচেয়ে বড় স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়ছে।

কোন খাবারে কোন ধাতু?

গবেষণায় বিস্কুট, পাউরুটি, কেক, ক্রিম রোল, টোস্ট, চানাচুর, চিপস, ঝালমুড়ি, ওয়েফার, নুডলস, মিল্ক পাউডার, চকলেট, হরলিকস, আইসক্রিম, ফলের জুস এবং বিভিন্ন পানীয়সহ মোট ৩২টি পণ্যের নমুনা পরীক্ষা করা হয়। এসব খাবারে মূলত **সিসা (Lead), ক্রোমিয়াম (Chromium), নিকেল (Nickel) ও তামা বা কপার (Copper)** শনাক্ত হয়েছে। তবে কোনো নমুনাতে ক্যাডমিয়াম ও আর্সেনিক পাওয়া যায়নি।

সবচেয়ে বেশি দূষণ যেগুলোতে:
ক্রিম রোল: পরীক্ষিত নমুনার মধ্যে ক্রিম রোলে ক্ষতিকর ধাতুর মাত্রা ছিল সবচেয়ে উদ্বেগজনক। প্রতি কেজিতে সর্বোচ্চ ৩৫.৭০ মিলিগ্রাম সিসা এবং ৩৫.৩৯ মিলিগ্রাম ক্রোমিয়াম পাওয়া গেছে।
মিল্ক চকলেট: প্রতি কেজিতে সিসা পাওয়া গেছে ২৯.৪৯ মিলিগ্রাম এবং ক্রোমিয়াম ২৬.৬৭ মিলিগ্রাম।
ওয়েফার: একটি নামী ব্র্যান্ডের ওয়েফারে প্রতি কেজিতে সর্বোচ্চ ২২.০০ মিলিগ্রাম কপার শনাক্ত হয়েছে।
চকলেট-২: এই নমুনায় প্রতি কেজিতে নিকেল পাওয়া গেছে ৫.৪২ মিলিগ্রাম।

অন্যান্য খাবারের চিত্র:

কেক ও ড্রাই কেক: কেকে ক্রোমিয়াম পাওয়া গেছে ৯.৩৫ মিলিগ্রাম পর্যন্ত এবং সিসা ১১.৩৩ মিলিগ্রাম/কেজি। ড্রাই কেকে সিসা পাওয়া গেছে ৪.৫৫ মিলিগ্রাম/কেজি।
পাউরুটি ও বিস্কুট: পাউরুটিতে সিসা ৩.১৩ মিলিগ্রাম/কেজি এবং বিস্কুটে সিসা ২.৫৫ থেকে ৪.৬৫ মিলিগ্রাম/কেজি পাওয়া গেছে।
দুগ্ধজাত পণ্য ও পানীয়: মিল্ক পাউডারে সিসা ২.৫০ মিলিগ্রাম/কেজি, হরলিকসে ৫.১৫ মিলিগ্রাম/কেজি এবং আইসক্রিম বারে ৪.১৮ মিলিগ্রাম/কেজি সিসা পাওয়া গেছে। বিভিন্ন সফট ড্রিংকসে সিসার মাত্রা ছিল ৩.৫৩ থেকে ১১.৮৮ মিলিগ্রাম/কেজি পর্যন্ত।

নমুনা সংগ্রহ ও গবেষণার পরিধি

যশোর জেলার বিভিন্ন খুচরা বিক্রয়কেন্দ্র থেকে ভিন্ন ভিন্ন উৎপাদন ব্যাচের মোড়কজাত নমুনা সংগ্রহ করে এই পরীক্ষা চালানো হয়। তবে গবেষকদের ভাষ্য মতে, পরীক্ষিত পণ্যগুলো সারা দেশেই বাজারজাত করা হয়। ফলে এই স্বাস্থ্যঝুঁকি শুধু যশোর বা নির্দিষ্ট কোনো অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা গোটা দেশের ভোক্তার জন্যই প্রযোজ্য।

খাদ্যে ভারী ধাতু আসে কোথা থেকে?
গবেষণায় কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা কারখানাকে এককভাবে দায়ী করা হয়নি। প্রতিবেদনে বলা হয়—
১. কৃষিজমির মাটি, দূষিত পানি ও বাতাস থেকে খাদ্য উপাদানের মাধ্যমে এটি খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করতে পারে।
২. কারখানাগুলোতে খাদ্য প্রক্রিয়াকরণের সময় ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি বা পাইপলাইন থেকে ধাতু খাবারে মিশতে পারে।
৩. খাদ্য সংরক্ষণ ও মোড়কজাতকরণে (প্যাকেজিং) ব্যবহৃত নিম্নমানের উপাদান থেকেও ভারী ধাতুর সংক্রমণ হতে পারে।

গবেষকদের সুপারিশ

গবেষণাটির প্রধান লেখক, যবিপ্রবির পুষ্টি ও খাদ্যপ্রযুক্তি বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী ও ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির প্রভাষক মো. সাখাওয়াত হোসাইন বলেন, 
“আমরা দৈনন্দিন জীবনে বিপুল পরিমাণে প্রক্রিয়াজাত খাদ্য গ্রহণ করি। গবেষণায় উদ্বেগজনক মাত্রায় ভারী ধাতুর উপস্থিতি দেখে বিষয়টি জাতীয় পর্যায়ে তুলে ধরার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করি। মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন অত্যন্ত জরুরি।”

গবেষক দল দেশে প্রক্রিয়াজাত খাবারের মাননিয়ন্ত্রণে নিয়মিত সরকারি নজরদারি, উৎপাদন ব্যবস্থায় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার, নিরাপদ প্যাকেজিং এবং জাতীয় খাদ্যমান কঠোরভাবে প্রয়োগের জোর সুপারিশ করেছে।

গবেষণাটিতে সংশ্লিষ্ট লেখক (করেসপন্ডিং অথর) হিসেবে ছিলেন সুবাসিশ দাস শুভ। অন্যান্য গবেষকরা হলেন—লিসা খানম, তাপস কুমার চক্রবর্তী, নিজাম উদ্দিন, ফারদিব মাহবুব, মো. মোস্তফা কামাল ও নাজিয়া নওশাদ লিনা।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।