বিয়ের ফাঁদে ফেলে ইতালি প্রবাসীর ২০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ

মিজানুর রহমান, সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টারঃ
৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৬:০৯ পিএম
শেয়ার করুন:
বিয়ের ফাঁদে ফেলে ইতালি প্রবাসীর ২০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ

মোবাইল ফোনে পরিচয়ের সূত্রে প্রেমের সম্পর্ক, এরপর ধুমধাম করে বিয়ের আয়োজন। তবে অভিযোগ উঠেছে, এই বিয়ের নেপথ্যে ছিল সুপরিকল্পিত প্রতারণার ফাঁদ। নিজেদের বিত্তবান জাহির করে ও বিয়ের নাটক সাজিয়ে ইতালি প্রবাসী এক যুবকের কাছ থেকে ধাপে ধাপে প্রায় ২০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে সুনামগঞ্জের এক তরুণী ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে।

ভুক্তভোগী এরশাদ ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার চরযশোরদী ইউনিয়নের চরযশোরদী গ্রামের আশরাফ আলীর ছেলে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ইতালিতে বসবাস করছেন। অন্যদিকে অভিযুক্ত তরুণী আরিফা রহমান ঐশী সুনামগঞ্জ জেলা সদরের ওয়েজখালী-তেঘরিয়া এলাকার লিটন মিয়া ও জিবলী বেগম দম্পতির মেয়ে।

ভুক্তভোগী পরিবার সূত্রে জানা যায়, মুঠোফোনে আলাপের মাধ্যমে এরশাদ ও ঐশীর প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। একপর্যায়ে তাদের মধ্যে বিয়ের কথা পাকাপোক্ত হয়। এ সময় ঐশী ও তার পরিবারের সদস্যরা নিজেদের অত্যন্ত প্রভাবশালী ও বিত্তশালী হিসেবে উপস্থাপন করেন। তারা দাবি করেন, ঐশীর বাবা লন্ডনে থাকেন, মা একজন কাউন্সিলর এবং সিলেট শহরে তাদের নিজস্ব বাড়ি রয়েছে। তাদের এমন বর্ণনায় বিশ্বাস স্থাপন করে এরশাদের পরিবার বিয়ের প্রস্তাব গ্রহণ করে। পরে সিলেটের একটি বাসা ভাড়া করে জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়, যেখানে দেনমোহর নির্ধারণ করা হয় ৮ লাখ টাকা।

বিয়ের পর থেকেই শুরু হয় নানা ছলে টাকা আদায়ের প্রক্রিয়া। ইতালি প্রবাসী এরশাদ অভিযোগ করে বলেন, “বিয়ের মাত্র কয়েকদিন পরই ব্যবসার কথা বলে ধার হিসেবে আমার কাছ থেকে ৮ লাখ টাকা নেওয়া হয়। এছাড়া একটি দামি আইফোন কেনা এবং বিভিন্ন সময়ে হাতখরচ হিসেবে ঐশী আমার কাছ থেকে আরও বিপুল অর্থ নেয়। পাশাপাশি বিভিন্ন কৌশলে আমার বাবার কাছ থেকেও ৮ লাখ ৬০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। সব মিলিয়ে তারা আমাদের প্রায় ১৯ থেকে ২০ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছে। আমি কল্পনাও করতে পারিনি যে বিয়ের নামে এমন প্রতারণার শিকার হব।”

এরশাদের বাবা আশরাফ আলী বলেন, “ছেলের বউকে নিজেদের বাড়ি নগরকান্দায় আনার পর কিছুদিন বাদে তাকে তার পৈতৃক বাড়িতে বেড়াতে নিয়ে যাই। সুনামগঞ্জে গিয়ে দেখি, তাদের আগের সব কথাবার্তাই মিথ্যা ও বানোয়াট। তারা সিলেট বা সুনামগঞ্জের কোনো বিত্তবান পরিবার নয়। বিষয়টি বুঝতে পেরে সন্দেহ হলে আমি পুত্রবধূকে পুনরায় নগরকান্দায় ফিরিয়ে আনি।”

ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, প্রতারণা প্রকাশ পাওয়ার পর মেয়েকে সুনামগঞ্জে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য নানা অদ্ভুত নাটক সাজায় ওই পরিবার। এমনকি একপর্যায়ে ঐশীর মা মারা গেছেন দাবি করে ভিডিও কলে লাশ ফ্রিজে রাখা আছে—এমন দৃশ্যও দেখানো হয়।

সর্বশেষ গত ৮ সেপ্টেম্বর পরিস্থিতি অন্যদিকে মোড় নেয়। মেয়েকে নগরকান্দার শ্বশুরবাড়িতে আটকে রেখে জিম্মি করা হয়েছে—এমন অভিযোগ তুলে নগরকান্দা থানা পুলিশের দ্বারস্থ হয় মেয়ের পরিবার। পরে পুলিশ গিয়ে মেয়েকে উদ্ধার করে তার বাবা-মায়ের জিম্মায় তুলে দেয়। 

নগরকান্দা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) রাসুল সামদানী আজাদ জানান, “মেয়ের পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় অভিযোগ করা হয়েছিল যে তাদের মেয়েকে আটকে রাখা হয়েছে। অভিযোগের প্রেক্ষিতে পুলিশ পাঠিয়ে মেয়েটিকে উদ্ধার করে তার পরিবারের জিম্মায় দেওয়া হয়। তবে ছেলে পক্ষ যদি প্রতারণার শিকার হয়ে থাকে, তবে তারা আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারেন।”

এদিকে, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে টাকা ফেরত দেওয়ার মৌখিক আশ্বাস ও একটি অঙ্গীকারনামা করা হয় বলে জানা গেছে। টাকা নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে অভিযুক্ত আরিফা রহমান ঐশী বলেন, “বিয়ের পর আমার পরিবার ৮ লাখ টাকা নিয়েছে এবং আমার শ্বশুর ও স্বামীর কাছ থেকে মা আরও ৮ লাখ ৬০ হাজার টাকা ধার নিয়েছিলেন। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে; কিছুটা সময় লাগলেও সেই টাকা ফেরত দেওয়া হবে।”

তবে পুরো ঘটনাকে একটি সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্রের কাজ বলে দাবি করছে ভুক্তভোগী পরিবার। বিয়ের নাটক সাজিয়ে কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার এই ঘটনায় তারা আদালতের মাধ্যমে প্রতারণা মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সেই সঙ্গে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে নিজেদের অর্থ উদ্ধার ও জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন তারা।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।