নবগঙ্গার বুকে মাঝিদের হাঁকডাক: মাগুরায় বর্ণাঢ্য নৌকাবাইচ ও লোকজ মেলা

বিশ্বজিৎ সিংহ রায়, স্টাফ রিপোর্টার, মাগুরাঃ
৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৮:৫১ পিএম
শেয়ার করুন:
নবগঙ্গার বুকে মাঝিদের হাঁকডাক: মাগুরায় বর্ণাঢ্য নৌকাবাইচ ও লোকজ মেলা

নদীর শান্ত জলরাশি চিরে ছুটে চলেছে সুসজ্জিত রঙিন নৌকা, ছন্দে ছন্দে পড়ছে মাঝিদের শক্ত হাতের দাঁড়। আর মাঝেমধ্যেই মাঝিদের সম্মিলিত কণ্ঠে গমকে উঠছে আবহমান বাংলার ‘হেঁইও রে হেঁইও’ ধ্বনি। নবগঙ্গার শান্ত জল যেন হঠাৎই ফিরে পেয়েছিল তার চিরচেনা প্রাণচাঞ্চল্য। নদীর দুই কূল ছাপিয়ে তখন হাজারো মানুষের ঢল—কেউ নদীর পাড়ে, কেউ উঁচু বাঁধে, আবার কেউ বেরইল-পলিতা সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে উপভোগ করছেন গ্রামবাংলার এই চিরায়ত ঐতিহ্য।

বুধবার মাগুরা সদর উপজেলার ১১ নম্বর বেরইল-পলিতা ইউনিয়নের বেরইল-পলিতা বাজারসংলগ্ন নবগঙ্গা নদীতে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হলো ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা ও গ্রামীণ লোকজ মেলা। বেরইল-পলিতা নৌকাবাইচ মেলা কমিটি ও স্থানীয় এলাকাবাসীর যৌথ উদ্যোগে এই মনোজ্ঞ উৎসবের আয়োজন করা হয়।

বুধবার বিকেলে প্রতিযোগিতা শুরুর আগেই নদীর দুই পাড়ে দূর-দূরান্ত থেকে দর্শক জড়ো হতে শুরু করেন। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে মানুষের ভিড় বাড়তে থাকে এবং বাইচ শুরু হওয়া মাত্রই পুরো নদীপাড় পরিণত হয় এক মিলনমেলায়।

প্রতিযোগিতায় মাঝিদের পেশিবহুল হাতের দাঁড়ের টানে নৌকাগুলো তীব্র গতিতে একে অপরকে ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। নৌকার গতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দুই তীরে উপস্থিত দর্শকদের উল্লাস, করতালি ও শিস পুরো পরিবেশকে মুখরিত করে তোলে। বিশেষ করে বেরইল-পলিতা সেতুটি যেন হয়ে উঠেছিল এক প্রাকৃতিক গ্যালারি। সেতুর ওপর হাজারো মানুষের ভিড়, নিচে নবগঙ্গার নীল জল আর মাঝখানে বাইচের নৌকার ছুটে চলা—সব মিলিয়ে তৈরি হয় এক নয়নাভিরাম দৃশ্য। 

শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে প্রবীণ ও নারীরাও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে এই উৎসব দেখতে এসেছিলেন। নৌকাবাইচ দেখতে শুধু স্থানীয় বাসিন্দারাই নন; মহম্মদপুর, শালিখা, শ্রীপুরসহ পার্শ্ববর্তী নড়াইল, ঝিনাইদহ ও বোয়ালমারী থেকেও বিপুলসংখ্যক দর্শনার্থীর আগমন ঘটে। অনেকেই মোবাইল ফোনে এই রোমাঞ্চকর দৃশ্য ক্যামেরাবন্দী করেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেন। 

নৌকাবাইচকে কেন্দ্র করে বেরইল-পলিতা বাজারসংলগ্ন মাঠে বসেছিল বর্ণাঢ্য গ্রামীণ মেলা। মেলায় বাহারি মিষ্টি, খাবার সামগ্রী, মাটির ও কাঠের তৈরি খেলনা, গ্রামীণ হস্তশিল্প এবং গৃহস্থালি নানা পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেন দোকানিরা। বাইচের আনন্দের পাশাপাশি মেলাও সাধারণ মানুষের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে। 

স্থানীয়রা জানান, আধুনিক বিনোদনের ভিড়ে বাংলার নদীকেন্দ্রিক এমন লোকজ ঐতিহ্য আজ প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে। একসময় বর্ষায় নৌকাবাইচ ছিল প্রধান সামাজিক উৎসব। দীর্ঘদিন পর নবগঙ্গার বুকে এমন আয়োজন নতুন প্রজন্মের সামনে বাংলার সমৃদ্ধ সংস্কৃতিকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে।

আয়োজক ও স্থানীয় সচেতন মহলের প্রত্যাশা, প্রতিবছর নিয়মিতভাবে এই নৌকাবাইচ ও লোকজ মেলার আয়োজন করা হলে এটি এই অঞ্চলের একটি স্থায়ী উৎসবে রূপ নেবে। এতে যেমন নদীমাতৃক বাংলার ঐতিহ্য টিকে থাকবে, তেমনি মানুষের পারস্পরিক সামাজিক বন্ধনও আরও সুদৃঢ় হবে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।