দৌলতপুরে পদ্মার পানি বৃদ্ধি: দুই ইউনিয়নে ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দি, বন্ধ ১৮ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান

দৌলতপুর প্রতিনিধিঃ মোঃ হারুন অর রশীদ
১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:৩১ পিএম
শেয়ার করুন:
দৌলতপুরে পদ্মার পানি বৃদ্ধি: দুই ইউনিয়নে ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দি, বন্ধ ১৮ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান

উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে পদ্মা নদীর পানি আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। এতে উপজেলার চিলমারী ও রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে অন্তত ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। তলিয়ে গেছে অধিকাংশ রাস্তাঘাট ও ফসলি জমি। এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে চিলমারী ও রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের ১৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠদান কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, ভারত থেকে ফারাক্কা হয়ে নেমে আসা ঢলে গত ২ সেপ্টেম্বর থেকে পদ্মায় পানি দ্রুত বাড়ছে। হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে গত এক সপ্তাহে পানি বেড়েছে প্রায় ৮৮ সেন্টিমিটার। প্রতিদিন গড়ে এখানে ১০ থেকে ১৪ সেন্টিমিটার করে পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) সকাল ৯টা পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যে এই পয়েন্টে পদ্মার পানি ১৩ দশমিক ০২ মিটারে প্রবাহিত হচ্ছিল, যা বিপৎসীমার (১৩ দশমিক ৮০ মিটার) মাত্র ৭৮ সেন্টিমিটার নিচে। 

অন্যদিকে উপজেলার ভাগজত পয়েন্টেও পানি বাড়ছে দ্রুতগতিতে। সেখানে প্রতিদিন গড়ে ১৫ থেকে ১৭ সেন্টিমিটার করে পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। শুক্রবার সকালে এই পয়েন্টে পানির উচ্চতা রেকর্ড করা হয় ১৪ দশমিক ৯০ মিটার (বিপৎসীমা ১৫ দশমিক ৫২ মিটার)। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে যে কোনো সময় নদী বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

নদীর পানি উপচে পড়ে চিলমারী ও রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের অভ্যন্তরীণ অধিকাংশ সড়ক তলিয়ে গেছে। ফলে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে ওই দুই ইউনিয়নের যোগাযোগ কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। হঠাৎ পানি বাড়ায় চরম বিপাকে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। বসতবাড়ির উঠানে পানি চলে আসায় গবাদিপশুর নিরাপত্তা, গো-খাদ্য ও বিশুদ্ধ খাবার পানির সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে।

কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, বন্যার পানিতে ফিলিপনগর, মরিচা, চিলমারী ও রামকৃষ্ণপুর এলাকার প্রায় ৩৫০ হেক্টর ফসলি জমি প্লাবিত হয়েছে। এতে রোপা আমন, কলা ও মরিচসহ বিভিন্ন মৌসুমি ফসল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রেহেনা পারভীন জানান, মাঠপর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তারা ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণে কাজ করছেন। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুত করে সরকারি সহায়তা ও পরামর্শ দেওয়া হবে।

এদিকে পানিবন্দি এলাকার ১৬টি প্রাথমিক ও দুটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শ্রেণি পাঠদান স্থানীয়ভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এ বিষয়ে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মুশতাক আহম্মেদ বলেন, “শিক্ষার্থীদের যাতায়াত ও নিরাপত্তার ঝুঁকি বিবেচনায় ক্লাস আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে। তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা উপজেলা প্রশাসন দেয়নি। স্কুল ভবনগুলো খোলা রাখা হয়েছে, যেন প্রয়োজনে দুর্যোগকবলিত মানুষ সেখানে নিরাপদ আশ্রয় নিতে পারেন।”

চিলমারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান বলেন, “উজান থেকে আসা ঢলে পুরো ইউনিয়নের সবকটি গ্রাম ও ফসলি জমি প্লাবিত হয়ে গেছে। রাস্তাঘাট তলিয়ে যাওয়ায় মানুষ একপ্রকার গৃহবন্দি হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। আমরা সার্বক্ষণিক পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছি এবং বিষয়টি উপজেলা প্রশাসনকে জানিয়েছি।”

দৌলতপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অনিন্দ্য গুহ জানান, বন্যাকবলিত এলাকার সার্বিক পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে উপজেলা প্রশাসন। পানিবন্দি অসহায় মানুষদের সহযোগিতার জন্য স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে জরুরি ত্রাণ তৎপরতা চালুর প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে চিলমারী ইউনিয়নের দুস্থ পরিবারগুলোর মাঝে সীমিত পরিসরে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা আরও বাড়ানো হবে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।