বেগমগঞ্জ উপজেলা নির্বাচন অফিস যেন দুর্নীতির আখড়া: ঘুষ ছাড়া মেলে না সেবা, জিম্মি সাধারণ মানুষ

রিপন মজুমদার, জেলা প্রতিনিধি, নোয়াখালিঃ
১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১১:০৪ এএম
শেয়ার করুন:
বেগমগঞ্জ উপজেলা নির্বাচন অফিস যেন দুর্নীতির আখড়া: ঘুষ ছাড়া মেলে না সেবা, জিম্মি সাধারণ মানুষ

নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলা নির্বাচন অফিস অনিয়ম ও দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ভোটার তালিকায় নতুন নাম অন্তর্ভুক্তকরণ, জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) সংশোধন, ভোটার এলাকা স্থানান্তর, আঙুলের ছাপ ও ছবি পরিবর্তনসহ নাগরিক সেবার প্রতিটি ধাপেই সেবাগ্রহীতাদের গুনতে হচ্ছে ঘুষ। সরকারি নিয়মে অধিকাংশ সেবা বিনামূল্যে বা নামমাত্র ফিতে পাওয়ার কথা থাকলেও সিন্ডিকেটের দাবি করা টাকা না দিলে কোনো ফাইল নড়ে না এখানে। 

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, সরকারি নিয়মে নতুন ভোটার হওয়ার কোনো নির্ধারিত ফি না থাকলেও সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে আবেদনপ্রতি ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। কোনো কোনো জটিল বা ভুয়া তথ্যভিত্তিক আবেদনের ক্ষেত্রে এ দাবির অঙ্ক ৫০ হাজার থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত গড়ায়।

অনুসন্ধানে জানা যায়, উপজেলা নির্বাচন অফিসকে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী দালাল সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। স্থানীয় চৌরাস্তা ও উপজেলা পরিষদ চত্বরের কিছু কম্পিউটার দোকানদারের যোগসাজশে চলে এ বাণিজ্য। কোনো সেবাগ্রহীতা দালাল ছাড়া সরাসরি দাপ্তরিক নিয়মে আবেদন জমা দিলে নানা অজুহাতে তাঁদের ফাইল আটকে দেওয়া হয় এবং দিনের পর দিন হয়রানি করা হয়। অথচ দালালের মাধ্যমে চুক্তি করে টাকা দিলে কোনো যাচাই-বাছাই ছাড়াই দ্রুত ছবি তোলা ও নিবন্ধনের কাজ শেষ হয়। সে ক্ষেত্রে আবেদনের পেছনে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাংকেতিক চিহ্ন বা বিশেষ স্বাক্ষর দেওয়া থাকে, যা দ্রুত কাজ শেষ করার ‘গ্রিন সিগন্যাল’ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

সম্প্রতি এক সেবাগ্রহীতার কাছ থেকে অফিস সহায়ক মো. সহিদ উল্যার ৭০ হাজার টাকা ঘুষ নেওয়ার একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এ ছাড়া জালিয়াতির মাধ্যমে ভিন্ন জেলার বাসিন্দাদেরও বেগমগঞ্জের ভোটার বানানোর অভিযোগ রয়েছে। 

শিহাব হোসেন নামের এক ভুক্তভোগী জানান, তিনি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকার ঠিকানা জালিয়াতি করে বেগমগঞ্জে ভোটার হয়েছেন। এ কাজের জন্য অফিসের ডেটা এন্ট্রি অপারেটর নাজমুল ও তামান্নাকে দিতে হয়েছে ৩০ হাজার টাকা। 

রসুলপুর গ্রামের প্রবাসী আবদুল করিম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “প্রবাসে থাকায় সময়মতো ভোটার হতে পারিনি। দেশে ফিরে নিজে সরাসরি আবেদন করতে গেলে কাগজপত্র ত্রুটিপূর্ণ বলে ফেরত দেওয়া হয়। পরে এক দালালের মাধ্যমে ৫ হাজার টাকা দিতেই কোনো সমস্যা ছাড়া আবেদন গৃহীত হয় এবং ছবি তোলা সম্পন্ন হয়।”

সেবাপ্রত্যাশীদের অভিযোগের তির উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা বুলবুল আহমেদ, সহকারী নির্বাচন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী হোসেন, অফিস সহায়ক মো. সহিদ উল্যা, পরিচ্ছন্নতাকর্মী মো. আরিফুর রহমান এবং ডেটা এন্ট্রি অপারেটর নাজমুল হোসেন ও তামান্না ফেরদৌসের দিকে।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সহকারী নির্বাচন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী হোসেন, অফিস সহায়ক মো. সহিদ উল্যা ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী মো. আরিফুর রহমান সাংবাদিকদের সঙ্গে কোনো কথা বলতে রাজি হননি।

তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করে উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা বুলবুল আহমেদ বলেন, “আমাদের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ তোলা হচ্ছে তা সত্য নয়। আমরা সর্বদা সাধারণ মানুষকে যথাযথ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করি।”

এ বিষয়ে নোয়াখালী জেলা জ্যেষ্ঠ নির্বাচন কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাদেকুল ইসলাম বলেন, “বেগমগঞ্জ নির্বাচন অফিসে সেবাগ্রহীতাদের হয়রানি ও দালাল চক্রের দৌরাত্ম্যের বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। পুরো বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। অফিসের ভেতরে বা বাইরের কেউ যদি এই অনিয়মের সঙ্গে জড়িত থাকে, তবে তদন্ত সাপেক্ষে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।