সাভারে ৫০০ টাকার ভাড়ায় আ.লীগের ‘ঝটিকা মিছিল’, নেপথ্যে বিদেশি অর্থায়ন ও ভাড়ার বাণিজ্য

অনলাইন ডেস্কঃ
২৭ আগস্ট, ২০২৬ ৪:০৯ পিএম
শেয়ার করুন:
সাভারে ৫০০ টাকার ভাড়ায় আ.লীগের ‘ঝটিকা মিছিল’, নেপথ্যে বিদেশি অর্থায়ন ও ভাড়ার বাণিজ্য

চা-সিঙ্গাড়ার আপ্যায়ন আর দিনশেষে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকার হাজিরা—এই লোভে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের ‘ঝটিকা মিছিলে’ অংশ নিচ্ছেন সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ ও পথশিশুরা। মূল নেতারা আত্মগোপনে থেকে লোক জড়ো করার জন্য দিনমজুরদের ভাড়া করছেন। মাত্র এক থেকে তিন মিনিটের মধ্যে ছবি ও ভিডিও ফুটেজ নেওয়া শেষ হলেই সটকে পড়ছেন আয়োজকেরা। আর মিছিল সফলভাবে সম্পন্ন করতে পারলে আয়োজকদের জন্য মিলছে অতিরিক্ত বকশিস। 

অনুসন্ধানে জানা যায়, গত তিন মাসে সাভার ও আশুলিয়ার বিভিন্ন নির্জন এলাকায় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের ব্যানারে বেশ কয়েকটি ঝটিকা মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। এসব মিছিলে ২০ থেকে ২৫ জনের বেশি উপস্থিতি থাকে না। সামনের সারিতে প্রথম বা দ্বিতীয় সারির দু-একজন নেতাকে রেখে বাকিদের ভাড়ায় এনে দাঁড় করানো হয়। এদের মধ্যে দিনমজুর, পথশিশু, ইটভাটা শ্রমিক ও পরিবহন খাতের কর্মীরা রয়েছেন।

**বিদেশে বসে দিকনির্দেশনা ও অর্থায়ন:**  
অনুসন্ধান ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ভারতে অবস্থানরত সাভার উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মঞ্জুরুল আলম রাজীব এসব মিছিলের দিকনির্দেশনা ও সময়সূচি নির্ধারণ করেন। তাঁর পরামর্শে ভারতে অবস্থানরত সাভার পৌর স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা তানভীর আহম্মেদ তনু যোগাযোগ করেন ঢাকা জেলা উত্তর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক সায়েম মোল্লা এবং সাভার ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম রুবেলের সাথে।

পরবর্তীতে সায়েম ও রুবেল সাভারের মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব দেন পৌর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক আলমগীর হোসেনকে। লোক জোগাড়ের জন্য আলমগীর তাঁর ঘনিষ্ঠ রাজমিস্ত্রি আপনকে দায়িত্ব দেন এবং মিছিলপ্রতি ৩০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পাঠান। অন্যদিকে সায়েম মোল্লা সরাসরি ইমরান হোসেন নামের এক ব্যক্তির কাছে প্রতি মিছিলে ৩০ হাজার টাকা পাঠাতেন। সেই টাকার ভাগ পেতেন আপনের ভাই দুলাল।

**ভাড়ার টাকায় কাটমানি:**  
মাঠপর্যায়ে দুলাল দিনমজুর ও পথশিশুদের ৫০০ টাকার কথা বলে ডেকে আনতেন। তবে মাথাপিছু নির্ধারিত ৩০০ থেকে ৫০০ টাকার বদলে তাঁদের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হতো মাত্র ১০০ থেকে ২০০ টাকা; বাকি টাকা মধ্যস্বত্বভোগীরা নিজেদের পকেটে পুরতেন। এরপর তাড়াহুড়ো করে ব্যানার ধরিয়ে ১ থেকে ৩ মিনিট ভিডিও ও ছবি ধারণ শেষে তা বিদেশে অবস্থানরত নেতাদের কাছে টেলিগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপের গোপন গ্রুপে পাঠানো হতো। 

একই কৌশলে বিরুলিয়া এলাকায় মিছিলের প্রস্তুতিকালে গ্রেপ্তার করা হয় ঢাকা মহানগর দক্ষিণ দারুসসালাম থানা আওয়ামী লীগের সদস্য সৌরভকে। প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা যায়, লোক সরবরাহের কথা বলে তিনি শীর্ষ নেতাদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন এবং লোক ভাড়া দেওয়াই ছিল তাঁর বর্তমান ব্যবসা।

সম্প্রতি মিছিলে অংশ নিয়ে গ্রেপ্তার হওয়া সোহাগ নামের এক কিশোর জানায়, ৫০০ টাকা দেওয়ার কথা বলে তাকে ও তার মাধ্যমে আরও ১০-১২ জন কিশোরকে মিছিলে আনা হয়েছিল। পরবর্তীতে ভিডিও ফুটেজ দেখে পুলিশ তাকে শনাক্ত করে।

**সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য:**  
ভাড়ায় লোক আনার অভিযোগ অস্বীকার করে সাভার সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সোহেল রানা মুঠোফোনে জানান, নিরীহ খেটে খাওয়া মানুষ ও কিশোরদের কোনো কারণ ছাড়াই আটক ও হয়রানি করা হচ্ছে। তাদের টাকা দিয়ে মিছিলে নেওয়ার দাবি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। 

বিরুলিয়া পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ আল আমিন জানান, গ্রেপ্তারকৃত সৌরভ প্রবাসে থাকা নেতাদের অর্থ ব্যবহার করে আমিনবাজার, হেমায়েতপুর ও গাবতলী এলাকায় ঝটিকা মিছিলের নামে লোক ভাড়ার বাণিজ্য চালাচ্ছিলেন। সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে বোট ক্লাবের সামনে থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।

সাভার মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) ইমতিয়াজ বলেন, হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ খুলে দেশ-বিদেশ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে যারা এসব মিছিলের আয়োজন করছিল, তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে তাদের তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। নেপথ্যের মূল অর্থদাতাদের শনাক্তে তদন্ত চলছে।

ঢাকা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) জাহাঙ্গীর আলম জানান, একটি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী অর্থের জোগান দিয়ে ছিন্নমূল ও খেটে খাওয়া মানুষকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে। গ্রেপ্তার আসামিদের কাছ থেকে বেশ কয়েকজন অর্থদাতার নাম পাওয়া গেছে। মূল পরিকল্পনাকারীদের আইনের আওতায় আনতে পুলিশ কাজ করছে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।