থানচি কলেজে এইচএসসিতে চরম বিপর্যয়, শিক্ষকদের দায়িত্বে অবহেলায় ক্ষুব্ধ অভিভাবকেরা

অনুপম মারমা, থানচি প্রতিনিধি, বান্দরবানঃ
৩১ অক্টোবর, ২০২৬ ৪:০৪ পিএম
শেয়ার করুন:
থানচি কলেজে এইচএসসিতে চরম বিপর্যয়, শিক্ষকদের দায়িত্বে অবহেলায় ক্ষুব্ধ অভিভাবকেরা

বান্দরবানের দুর্গম পাহাড়ি উপজেলা থানচির একমাত্র উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ‘থানচি কলেজ’-এ এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে চরম বিপর্যয় ঘটেছে। চলতি বছর পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ৫৩ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছেন মাত্র ১৩ জন। পাসের হার দাঁড়িয়েছে মাত্র ২৪ দশমিক ৫৩ শতাংশে, যার মধ্যে কেউ জিপিএ-৫ পাননি। শনিবার (৩১ অক্টোবর) দুপুরে ফলাফলের এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন কলেজের অধ্যক্ষ ধমিনিক ত্রিপুরা।

ফলাফলের এমন নজিরবিহীন পতনে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মাঝে চরম ক্ষোভ, হতাশা ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। অভিভাবকদের অভিযোগ—শিক্ষকদের দায়িত্বে চরম অবহেলা, অনিয়মিত পাঠদান এবং শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত না থাকার কারণেই এই ভরাডুবি হয়েছে। তাঁদের আশঙ্কা, এ অবস্থা চলতে থাকলে দুর্গম অঞ্চলের প্রান্তিক শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন অঙ্কুরেই বিনষ্ট হবে।

স্থানীয়দের প্রশ্ন, সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা এবং অভিভাবকদের কষ্টার্জিত অর্থে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালিত হলেও কাঙ্ক্ষিত শিক্ষার পরিবেশ কেন নিশ্চিত করা যাচ্ছে না? শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে এমন দায়িত্বজ্ঞানহীনতার দায় কে নেবে?

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক অভিভাবক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের নিয়মিত উপস্থিতি ও দায়িত্বশীল পাঠদান নিশ্চিত না হলে ভালো ফলাফল কোনোভাবেই সম্ভব নয়। শুধু পরীক্ষার আগে লোকদেখানো পরামর্শ দেওয়া কিংবা ফলাফল প্রকাশের পর দায় এড়িয়ে যাওয়া কাম্য নয়। শিক্ষকদের গাফিলতির বিষয়টি অবশ্যই জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত। 

তাঁরা আরও জানান, দুর্গম পাহাড়ের প্রতিকূল পরিবেশ জয় করে দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে এখানকার শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করে। তাদের জন্য থানচি কলেজই উচ্চমাধ্যমিকের একমাত্র ভরসা। কিন্তু ফলাফল যদি ধারাবাহিকভাবে এভাবে নিম্নমুখী হতে থাকে, তবে দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের সামনে এগোনো অসম্ভব হয়ে পড়বে।

সন্তানের ফলাফল বিপর্যয়ে হতাশা প্রকাশ করে উপজেলার লিটক্রে ইয়াংব পাড়ার বাসিন্দা দনরয় ম্রো বলেন, “অনেক আশা ও কষ্ট করে সন্তানদের কলেজে পাঠাই। কিন্তু শিক্ষকেরা যদি নিয়মিত ক্লাসে না আসেন, আন্তরিকতার সঙ্গে না পড়ান, তবে শিক্ষার্থীরা শিখবে কীভাবে? ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যৎ নিয়ে এমন হেলাফেলা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।”

কলেজের অধ্যক্ষ ধমিনিক ত্রিপুরার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে কলেজটি প্রতিষ্ঠার পর প্রথম এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ২২ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ১৩ জন উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে ফলাফলে দৃশ্যমান উন্নতি হয় এবং একপর্যায়ে পাসের হার ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত উন্নীত হয়েছিল। এমনকি ২০২৫ সালেও পাসের হার ছিল ৬১ দশমিক ০৯ শতাংশ। অথচ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে ২০২৬ সালে তা নেমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২৪ দশমিক ৫৩ শতাংশে। 

কলেজ সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর ৫৪ জন শিক্ষার্থী নিবন্ধিত হলেও একজন অনুপস্থিত থাকায় পরীক্ষায় অংশ নেন ৫৩ জন। তাঁদের মধ্যে পাস করেছেন মাত্র ১৩ জন। উত্তীর্ণদের কেউই কাঙ্ক্ষিত জিপিএ-৫ অর্জন করতে পারেননি।

ফলাফল বিপর্যয়ের কারণ জানতে চাইলে অধ্যক্ষ ধমিনিক ত্রিপুরা পরিসংখ্যানবিষয়ক তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করলেও এ বিপর্যয়ের সুনির্দিষ্ট কারণ নিয়ে সাংবাদিকদের কাছে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

অভিভাবক ও স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, শুধু ফলাফল প্রকাশের মধ্য দিয়েই কলেজ কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব শেষ হতে পারে না। ক্লাসে নিয়মিত পাঠদান, যথাসময়ে পাঠ্যসূচি শেষ করা এবং শিক্ষার্থীদের নিয়মিত মূল্যায়নের পাশাপাশি শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনা এখন জরুরি। একই সঙ্গে ফলাফল বিপর্যয়ের কারণ অনুসন্ধানে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ী শিক্ষকদের দ্রুত জবাবদিহির আওতায় আনার জোর দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।