ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও বর্ণিল আয়োজনে কাপ্তাইয়ে প্রবারণা পূর্ণিমা উদ্‌যাপিত

রিপণ মারমা, কাপ্তাই প্রতিনিধি, রাঙ্গামাটিঃ
২৬ অক্টোবর, ২০২৬ ৯:০১ পিএম
শেয়ার করুন:
ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও বর্ণিল আয়োজনে কাপ্তাইয়ে প্রবারণা পূর্ণিমা উদ্‌যাপিত

ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে রাঙামাটির কাপ্তাইয়ে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব ‘প্রবারণা পূর্ণিমা’ উদ্‌যাপিত হচ্ছে। উৎসবকে কেন্দ্র করে কাপ্তাইয়ের প্রতিটি বৌদ্ধবিহার ও আশপাশের পাহাড়ি পল্লীগুলোতে এখন বইছে আনন্দের জোয়ার।

গতকাল রোববার দিনব্যাপী নানা ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে এই মহোৎসবের সূচনা হয়। উৎসবের কর্মসূচির মধ্যে ছিল—বুদ্ধপূজা, শিবলী পূজা, পঞ্চশীল ও অষ্টশীল গ্রহণ, ধর্মদেশনা, ধ্যান অনুশীলন, দেশ ও জাতির মঙ্গল কামনায় বিশেষ প্রার্থনা, বুদ্ধ স্নান, হাজারো প্রদীপ প্রজ্বলন এবং আকাশে ফানুস ওড়ানো। আজ সোমবার উৎসবের দ্বিতীয় দিনেও গোধূলিলগ্ন থেকে আকাশে শত শত বর্ণিল ফানুস ওড়ানো হচ্ছে।

সোমবার সকালে ঐতিহ্যবাহী চিৎমরম বৌদ্ধবিহারসহ উপজেলার বিভিন্ন বিহার ঘুরে দেখা যায়, মারমা সম্প্রদায়ের নারী-পুরুষ ও শিশুরা নতুন পোশাকে বিহারে সমবেত হয়েছেন। গৃহিণীরা ঘরে তৈরি উন্নতমানের নানা পদ ও মিষ্টান্ন নিয়ে বিহারে উপস্থিত হয়ে পূজনীয় ভিক্ষুসংঘকে দান করেন। এরপর ভক্তরা দেশ ও জাতির সুখ, শান্তি এবং সমৃদ্ধি কামনায় বিশেষ প্রার্থনায় অংশ নেন। উৎসব উপলক্ষে বিহার ও পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলো রঙিন প্যান্ডেল ও আলোকসজ্জায় সাজিয়ে তোলা হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা হলাসুইয়ে মং মারমা এবং সাবেক ইউপি সদস্য মিচিংপ্রু মারমা জানান, প্রবারণা উৎসব শুধু বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; পাহাড়ে বসবাসরত সব ধর্মের মানুষই এতে শামিল হন। ফলে এটি সব সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির এক অনন্য মিলনমেলায় পরিণত হয়।

উল্লেখ্য, আষাঢ়ী পূর্ণিমা থেকে আশ্বিনী পূর্ণিমা পর্যন্ত বৌদ্ধ ভিক্ষুদের তিন মাসব্যাপী চলা ‘বর্ষাব্রত’ (বর্ষাবাস) সমাপ্তির পরই এই প্রবারণা পূর্ণিমা উদ্‌যাপিত হয়। আর এই উৎসব শেষ হওয়ার পর থেকেই মাসব্যাপী শুরু হবে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের সর্ববৃহৎ দানযজ্ঞ ‘কঠিন চীবর দানোৎসব’।

বৌদ্ধ ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, সিদ্ধার্থ গৌতম যখন বোধিসত্ত্ব রূপে শ্রাবস্তী নগর থেকে গৃহত্যাগ করেছিলেন, তখন অনোমা নদীর তীরে তিনি নিজের চুল কেটে ঊর্ধ্বাকাশে নিক্ষেপ করেন। ভক্তদের বিশ্বাস, সেই পবিত্র কেশগুচ্ছ মহাতাবতিংস স্বর্গের ‘চুলামনি প্যাগোডা’য় সংরক্ষিত রয়েছে। সেই পবিত্র স্মৃতি এবং প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে তথাগত ভগবান বুদ্ধের তাবতিংস স্বর্গ থেকে মানবজগতে অবতরণের ঘটনাকে স্মরণ করেই প্রবারণায় প্রদীপ প্রজ্বলন ও আকাশে ফানুস ওড়ানো হয়।

উৎসবের সমাপনী দিন আগামীকাল মঙ্গলবার রাইখালী নারানগিরি বৌদ্ধবিহারে বিশেষ ধর্মীয় আয়োজন রয়েছে। সেখানে ময়ূরের আদলে তৈরি একটি দৃষ্টিনন্দন রথে গৌতম বুদ্ধের প্রতিমূর্তি স্থাপন করা হবে। এরপর ভক্তদের রশি টানার মধ্য দিয়ে রথটি হাপছড়ি প্রদক্ষিণ করে মাঝিপাড়া হয়ে নিয়ে যাওয়া হবে কর্ণফুলী নদীতে। সেখানে ধর্মীয় আচার শেষে রথটি নদীতে ভাসিয়ে দেওয়ার মধ্য দিয়েই পর্দা নামবে তিন দিনব্যাপী এই বর্ণিল প্রবারণা উৎসবের।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।