এক হাতে কাঁচি, অন্য হাতে জ্ঞানের আলো: সেলুনে পাঠাগার গড়ে রাজুর অনন্য দৃষ্টান্ত

বিশ্বজিৎ সিংহ রায়, স্টাফ রিপোর্টার, মাগুরাঃ
২৬ অক্টোবর, ২০২৬ ৯:২০ পিএম
শেয়ার করুন:
এক হাতে কাঁচি, অন্য হাতে জ্ঞানের আলো: সেলুনে পাঠাগার গড়ে রাজুর অনন্য দৃষ্টান্ত

এক হাতে কাঁচি, অন্য হাতে জ্ঞানের আলো ছড়ানোর স্বপ্ন! মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলায় সেলুনের ভেতরেই এক ব্যতিক্রমী পাঠাগার গড়ে তুলে এলাকায় আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন রাজু আহমেদ নামের এক তরুণ। চুল ও দাড়ি কাটার অপেক্ষার সময়টুকু অপচয় না করে গ্রাহকদের বইয়ের জগতে ডুব দেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন তিনি। পেশায় সেলুনকর্মী হলেও বইয়ের প্রতি গভীর অনুরাগ আর নতুন প্রজন্মের মধ্যে জ্ঞানচর্চা ছড়িয়ে দেওয়ার প্রত্যয় রাজুকে পরিণত করেছে এক অনন্য অনুপ্রেরণায়।

মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলার বালিদিয়া ইউনিয়নের শিকদারের মোড়ে অবস্থিত রাজুর এই সেলুন। বাইরে থেকে সাধারণ মনে হলেও ভেতরে ঢুকলে চোখে পড়বে এক ভিন্ন দৃশ্য। সেলুনের এক কোণে সাজানো রয়েছে ছোট একটি পাঠাগার। সেখানে শোভা পাচ্ছে ইসলামিক বই, কবিতা, উপন্যাসসহ জীবনধর্মী নানা গ্রন্থ। সেলুনে সেবা নিতে আসা নানা বয়সি মানুষ, বিশেষ করে তরুণরা এখন অলস সময় বা মুঠোফোনে বুঁদ না থেকে বইয়ের পাতা উল্টে সময় কাটাচ্ছেন।

ব্যতিক্রমী এই উদ্যোগের পেছনে রয়েছে রাজুর এক তিক্ত ও অপমানের অভিজ্ঞতা। রাজু জানান, একবার এক ব্যক্তি তাঁকে উদ্দেশ্য করে কটূক্তি করে বলেছিলেন—*‘তুমি অশিক্ষিত, নাপিতের কাজ করো, এখান থেকে যাও।’* সমাজের এমন অবহেলা ও অপমানজনক মন্তব্যে ভেঙে পড়েননি রাজু। বরং তিনি প্রতিজ্ঞা করেন, পেশাগত পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সমাজের মানুষের জন্যই কিছু করবেন। অপমানের জবাব দিতে তিনি বেছে নেন জ্ঞানের পথ। নিজের সেলুনেই বইয়ের সম্ভার সাজিয়ে মানুষের চিন্তাকে আলোকিত করার উদ্যোগ নেন। তাঁর এই প্রয়াস আজ প্রমাণ করেছে, ভালো কাজের জন্য বড় প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয় নয়, সুন্দর মনের একটি ইচ্ছাই যথেষ্ট।

শুধু বই পড়ার সুযোগ তৈরি করেই থেমে থাকেননি রাজু; সেলুনটিকে রূপ দিয়েছেন এক টুকরো মানবিকতার ঠিকানায়। তাঁর সেলুনে মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তি, সমাজের এতিম শিশু ও স্থানীয় ইমামদের কাছ থেকে কোনো টাকা নেওয়া হয় না। সম্পূর্ণ বিনামূল্যে তাদের সেবা দেন তিনি। নিজের সীমিত আয়ের মধ্যেও সমাজের অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এই মানবিকতা তাঁর উদ্যোগকে দিয়েছে এক অনন্য মাত্রা।

রাজুর সেলুন এখন আর নিছক চুল-দাড়ি কাটার স্থান নয়; এটি হয়ে উঠেছে বইপড়া, জ্ঞানচর্চা ও সহমর্মিতার এক উষ্ণ মিলনমেলা। তাঁর এই উদ্যোগ মনে করিয়ে দেয়—সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে বিশাল কোনো আয়োজনের প্রয়োজন হয় না। কখনো কখনো ছোট্ট একটি সেলুন, কয়েকটি বই আর মানুষের জন্য কিছু করার অদম্য ইচ্ছাই বদলে দিতে পারে সমাজকে, হয়ে উঠতে পারে বেঁচে থাকার সেরা প্রেরণা।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।