কালকিনিতে তাইজুল হত্যার জেরে সাবেক চেয়ারম্যানের বাড়িসহ ১৯ ঘরে আগুন ও লুটপাট, অর্ধশত ককটেল বিস্ফোরণ

জাহিদ (কালকিনি) মাদারীপুর প্রতিনিধিঃ
২৬ অক্টোবর, ২০২৬ ৭:১৯ পিএম
শেয়ার করুন:
কালকিনিতে তাইজুল হত্যার জেরে সাবেক চেয়ারম্যানের বাড়িসহ ১৯ ঘরে আগুন ও লুটপাট, অর্ধশত ককটেল বিস্ফোরণ

মাদারীপুরের কালকিনিতে বোরকা পরে হামলা চালাতে গিয়ে তাইজুল সরদার নিহত হওয়ার ঘটনার জেরে ব্যাপক সহিংসতা চালানো হয়েছে। নিহত তাইজুলের মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে উপজেলার আলীনগর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও সৌদি প্রবাসীদের বাড়িসহ অন্তত ১৯টি বসতঘরে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট শেষে অগ্নিসংযোগ করেছে দুর্বৃত্তরা। হামলা চলাকালে পুরো এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টি করতে অর্ধশত ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। 

সোমবার (২৬ অক্টোবর) সকালে উপজেলার আলীনগর ইউনিয়নের কালীনগর ও টুমচর গ্রামে এ নারকীয় তাণ্ডব চালানো হয়। খবর পেয়ে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন এবং পরিস্থিতি শান্ত করেন। বর্তমানে এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

পুলিশ, ভুক্তভোগী ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ২২ অক্টোবর সকালে কালকিনি উপজেলার আলীনগর ইউনিয়নের কালিগঞ্জ বাজারে হানিফ হাওলাদারের চায়ের দোকানে বসে আড্ডা দিচ্ছিলেন আলীনগর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য হাফিজুর রহমান মিলন সরদারসহ স্থানীয় কয়েকজন। এ সময় মাদারীপুর সদর উপজেলার ‘চর কুলপদ্বী’ এলাকার মৃত রুস্তুম আলী সরদারের ছেলে তাইজুল সরদার (২২) আরও দুই সহযোগীকে নিয়ে ইজিবাইকে করে বোরকা পরে এসে অতর্কিত হামলা চালায়। হামলাকারীরা প্রথমে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে জহির ও মহসিন নামের দুই ভাইকে কুপিয়ে জখম করে। এ সময় স্থানীয় জনতা পাল্টা ধাওয়া দিয়ে তাইজুল ও আল-আমিন নামের দুজনকে কুপিয়ে জখম করলে ঘটনাস্থলেই হামলাকারী তাইজুল মারা যান।

ওই ঘটনার পর থেকেই এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি ও উত্তেজনা বিরাজ করছিল। এরই ধারাবাহিকতায় সোমবার সকালে তাইজুল হত্যার প্রতিশোধ নিতে শতাধিক দুর্বৃত্ত দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে একযোগে কালীনগর ও টুমচর গ্রামে হামলা চালায়। তারা মুহুর্মুহু ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়। 

হামলাকারীরা প্রথমে সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান হাফিজুর রহমান মিলন সরদারের কালীনগর গ্রামের বসতবাড়িতে হামলা চালায়। পরে টুমচর গ্রামের নুরু হাওলাদারের চার সৌদি প্রবাসী ছেলে—আলী হোসেন হাওলাদার, বরকত হাওলাদার, মফিজুল হাওলাদার ও রহিম হাওলাদারের ঘরসহ মৃত মজিদ হাওলাদারের ছেলে লোকমান, লুৎফর, দুলাল; আজিজ সরদারের ছেলে সৌদি প্রবাসী ইদ্রিস সরদার এবং রুমান আকন, আউয়াল চৌকিদার, ইদ্রিস চৌকিদার, জহির চৌকিদার, মহসিন চৌকিদার, আজিম চৌকিদার ও জসিম চৌকিদারসহ প্রায় ১৯টি বসতঘরে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। সবশেষে ঘরগুলোতে পেট্রল ও আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিয়ে দ্রুত এলাকা ত্যাগ করে দুর্বৃত্তরা।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, তাইজুল নিহতের ঘটনায় গ্রেপ্তার আতঙ্কে গ্রামের পুরুষরা বাড়িছাড়া থাকার সুযোগে এই নারকীয় হামলা চালানো হয়েছে। 

ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্য নুরুন্নাহার বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “সকালে কিছু বুঝে ওঠার আগেই শত শত মানুষ লাঠিসোটা ও অস্ত্র নিয়ে আমাদের বাড়িঘরে হামলা চালায়। আমরা কোনোমতে পালিয়ে জীবন বাঁচিয়েছি। আমার চার ভাই সৌদি আরবে থাকে, বাড়িতে শুধু বয়োবৃদ্ধ মা থাকেন। আমরা কোনো রাজনীতির সাথেও জড়িত নই। অথচ ঘরের সব মালামাল লুট করে নিয়ে যাওয়ার সময় আমাদের ঘরগুলোতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হলো। আমরা এখন নিঃস্ব হয়ে রাস্তায় বসে গেছি। আমরা এই অন্যায়ের বিচার চাই।”

স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, ২২ অক্টোবরের ঘটনার পর এমন একটি হামলার শঙ্কা আগে থেকেই ছিল। কিন্তু পুলিশের নজরদারি ও তৎপরতা ঢিলেঢালা হওয়ার সুযোগেই নিরীহ মানুষের বসতবাড়িতে এই হামলা ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।

এ বিষয়ে মাদারীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “পুলিশ সুপার মহোদয়সহ আমরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘরের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ ঘটনায় এখনো কোনো লিখিত অভিযোগ বা মামলা দায়ের হয়নি, তবে পুলিশের পক্ষ থেকে তদন্ত চলছে। তদন্ত সাপেক্ষে জড়িতদের চিহ্নিত করে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।”

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।