পাহাড়ে প্রবারণার আমেজ: কাপ্তাইয়ে ‘ওয়াগ্যোয়াই পোয়ে’ ঘিরে সাজসাজ রব

রিপণ মারমা, কাপ্তাই প্রতিনিধি, রাঙ্গামাটিঃ
২২ অক্টোবর, ২০২৬ ৬:১৯ পিএম
শেয়ার করুন:
পাহাড়ে প্রবারণার আমেজ: কাপ্তাইয়ে ‘ওয়াগ্যোয়াই পোয়ে’ ঘিরে সাজসাজ রব

বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী মারমা সম্প্রদায়ের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব ‘ওয়াগ্যোয়াই পোয়ে’ (প্রবারণা পূর্ণিমা) উপলক্ষে রাঙামাটির কাপ্তাইয়ে বইছে আনন্দের হাওয়া। মারমা ভাষায় ‘ওয়াগ্যোয়াই’ অর্থ প্রবারণা পূর্ণিমা এবং ‘পোয়ে’ মানে উৎসব। দিনটি যতই ঘনিয়ে আসছে, কাপ্তাইয়ের পাহাড়ি পাড়া-মহল্লায় ততই বাড়ছে উৎসবের সাজসাজ রব। উৎসবের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ময়ূর আকৃতির রথযাত্রা ও আকাশ প্রদীপ (ফানুস) ওড়ানোকে কেন্দ্র করে দিনরাত ব্যস্ত সময় পার করছেন স্থানীয় তরুণরা।

উৎসবকে বরণ করে নিতে কাপ্তাইয়ের প্রতিটি গ্রাম ও পল্লীতে চলছে ফানুস তৈরির নিপুণ কর্মযজ্ঞ। বাঁশের সরু কাঠি, রঙিন কাগজ আর আঠার শৈল্পিক কারুকাজে তৈরি হচ্ছে নান্দনিক সব ফানুস, যা প্রবারণা পূর্ণিমার রাতে বর্ণিল আলোয় রাঙিয়ে তুলবে কাপ্তাইয়ের আকাশ। একই সঙ্গে ঘরবাড়ি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও সাজসজ্জার কাজও চলছে জোরেশোরে।

কর্মসূচি অনুযায়ী, আগামী ২৫ অক্টোবর রাতে গ্রাম-পল্লীর পাশাপাশি স্থানীয় বৌদ্ধ বিহারগুলোতে তরুণ-তরুণীদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হবে ঐতিহ্যবাহী পিঠা তৈরির প্রতিযোগিতা। সারারাত ধরে তৈরি এসব সুস্বাদু পিঠা পরদিন ভোরে বৌদ্ধ বিহারের ভান্তেদের (সংঘ) উদ্দেশে উৎসর্গ ও দান করা হবে। 

উৎসবের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রবিন্দু কাপ্তাইয়ের ঐতিহ্যবাহী চিৎমরম বৌদ্ধ বিহার। এখানকার ঐতিহাসিক ‘সত্য বুদ্ধ’ মূর্তি দর্শনে উৎসবের দিনগুলোতে দূর-দূরান্ত থেকে লাখো পুণ্যার্থীর ঢল নামে। পূর্ণিমার দিন সকাল থেকেই পাহাড়ি জনপদ মুখরিত হয়ে উঠবে ঢাকঢোল আর কাঁসরের বাদ্যে; নেচে-গেয়ে মেতে উঠবেন সর্বস্তরের মানুষ। বিহারগুলোতে শোভাযাত্রা সহকারে নিয়ে যাওয়া হবে ‘কল্পতরু’ বা টাকার গাছ। ভান্তেদের উদ্দেশে পঞ্চশীল গ্রহণ, বুদ্ধপূজা, সংঘদান, পিন্ডদান ও ছোয়াং (খাদ্যসামগ্রী) দান করা হবে। সন্ধ্যায় সহস্র প্রদীপ প্রজ্বলন এবং একসঙ্গে শত শত ফানুস ওড়ানোর মধ্য দিয়ে আনন্দের আমেজ পৌঁছাবে চূড়ান্তে।

তিন দিনব্যাপী এই ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসবের সমাপ্তি ঘটবে আগামী ২৭ অক্টোবর এক বর্ণাঢ্য রথযাত্রার মধ্য দিয়ে। ওই দিন কাপ্তাইয়ের রাইখালী নারানগিরি বৌদ্ধ বিহার থেকে ময়ূরের আদলে তৈরি একটি দৃষ্টিনন্দন রথে গৌতম বুদ্ধের প্রতিমূর্তি বসিয়ে ভক্তরা রশি টেনে রথযাত্রা শুরু করবেন। সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণে রথটি হাপছড়ি প্রদক্ষিণ করে মাঝিপাড়ায় এসে পৌঁছাবে। এরপর ঐতিহ্যবাহী ময়ূর রথটি কর্ণফুলী নদীতে বিসর্জনের মধ্য দিয়ে মারমা সম্প্রদায়ের এই ঐতিহ্যবাহী উৎসবের ইতি টানা হবে।

উৎসবের সার্বিক প্রস্তুতি ও তাৎপর্য নিয়ে রাঙামাটি জেলা পরিষদের সদস্য উথোয়াই মং মারমা বলেন, “ওয়াগ্যোয়াই উৎসব আমাদের মারমা সম্প্রদায়ের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির এক অনন্য প্রতীক। এই উৎসব পাহাড়ে সৌহার্দ্য, ভ্রাতৃত্ববোধ ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে আরও সুদৃঢ় করে।”

স্থানীয় সংরক্ষিত নারী ইউপি সদস্য মিনুপ্রু মারমা বলেন, “উৎসব ঘিরে পাড়ায় পাড়ায় এখন অনাবিল আনন্দের আমেজ বিরাজ করছে। বিশেষ করে নারীরা পিঠা তৈরি ও ঘরবাড়ি সাজানোর কাজে তুমুল ব্যস্ত সময় পার করছেন।”

স্থানীয় বাসিন্দা সাচিংউ মারমা জানান, “প্রবারণা পূর্ণিমা আমাদের জীবনে শান্তি ও মৈত্রীর বার্তা নিয়ে আসে। ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও যথাযথ উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে উৎসবটি উদযাপনের লক্ষ্যে আমরা সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছি।”

উল্লেখ্য, বৌদ্ধ ভিক্ষুদের তিন মাসের বর্ষাবাস (আত্মশুদ্ধি ও ধ্যানের বিশেষ সময়) শেষ হওয়ার আনন্দেই মারমা সম্প্রদায়সহ বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা এই প্রবারণা পূর্ণিমা উদযাপন করে থাকেন। বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের বিশ্বাস, শাস্ত্রীয় বিধান অনুযায়ী এই পূর্ণিমা পালনের মাধ্যমে ভিক্ষু ও গৃহী উভয়েরই অতীত পাপমোচন হয় এবং পরিবার ও সমাজে অনাবিল শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।