সাঙ্গু নদে নৌকা দুর্ঘটনা: অনিশ্চয়তায় শিক্ষার্থী সাবিত্রীর শিক্ষাজীবন, চিকিৎসার জন্য সহায়তার আকুতি

অনুপম মারমা, থানচি প্রতিনিধি, বান্দরবানঃ
৩০ অক্টোবর, ২০২৬ ৯:২৫ পিএম
শেয়ার করুন:
সাঙ্গু নদে নৌকা দুর্ঘটনা: অনিশ্চয়তায় শিক্ষার্থী সাবিত্রীর শিক্ষাজীবন, চিকিৎসার জন্য সহায়তার আকুতি

বান্দরবানের থানচিতে সাঙ্গু নদে দুটি ইঞ্জিনচালিত নৌকার মুখোমুখি সংঘর্ষে গুরুতর আহত হয়েছে থানচি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী সাবিত্রী ত্রিপুরা। নৌকার ইঞ্জিনের আঘাতে তার একটি হাতের আঙুল মারাত্মকভাবে ক্ষতবিক্ষত হয়েছে। বর্তমানে সে কক্সবাজারের চকরিয়ার মালুমঘাট মেমোরিয়াল খ্রিস্টান হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও বিপুল খরচের আশঙ্কায় দরিদ্র পরিবারটি চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছে। মেয়ের সুচিকিৎসার জন্য সমাজের বিত্তবান ও সহৃদয় ব্যক্তিদের আর্থিক সহায়তার আকুতি জানিয়েছেন অসহায় মা-বাবা।

ছুটি শেষে হোস্টেলে ফেরার পথে দুর্ঘটনা
জানা গেছে, গত বুধবার (২৮ অক্টোবর) সকাল ১০টার দিকে সাঙ্গু নদের ইয়াংহ্রেস এলাকায় এই দুর্ঘটনা ঘটে। শারদীয় দুর্গাপূজার ছুটি শেষে দুর্গম রেমাক্রী ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের কালু ত্রিপুরাপাড়া থেকে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় করে থানচি সদরে ফিরছিল দুই শিক্ষার্থী। তারা স্থানীয় ‘যিহোবা যিরি ব্যাপ্টিস্ট মিশন’ হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করত। 

নৌকাটি ইয়াংহ্রেস এলাকায় পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে আসা আরেকটি নৌকার সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে সাবিত্রী ত্রিপুরা ও ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী হেনা ত্রিপুরা নৌকা থেকে ছিটকে পড়ে। এ সময় নৌকার ইঞ্জিনের পাখার আঘাতে সাবিত্রীর হাতের দুটি আঙুল ক্ষতবিক্ষত হয়। স্থানীয়রা দ্রুত তাদের উদ্ধার করে থানচি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে হেনা ত্রিপুরাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে হোস্টেলে ফেরত পাঠানো হলেও সাবিত্রীর অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য চকরিয়ার মালুমঘাট হাসপাতালে পাঠানো হয়।

চিকিৎসার বিপুল ব্যয়ে দিশেহারা পরিবার
রেমাক্রী ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য জন ত্রিপুরা ও কালুপাড়ার বাসিন্দা জয়বা ত্রিপুরা জানান, ঘটনার পর স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মধ্যস্থতায় দুর্ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নৌকার মাঝি ও মালিকপক্ষের পক্ষ থেকে চিকিৎসার জন্য প্রাথমিকভাবে ৪০ হাজার টাকা সহায়তা দেওয়া হয়েছে।

তবে সাবিত্রীর বাবা দরিদ্র কৃষক পিলিপ্স ত্রিপুরা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, *“হাসপাতালের চিকিৎসক হেরল স্যার জানিয়েছেন, মেয়ের হাতের আঙুলে বড় ধরনের অস্ত্রোপচার করাতে হবে। চিকিৎসা শেষ হতে দীর্ঘ সময় লাগবে এবং প্রায় ৩ থেকে ৫ লাখ টাকা খরচ হতে পারে। আমি একজন দিনমজুর, এত টাকা জোগাড় করা আমার পক্ষে অসম্ভব। মেয়ের হাতটি রক্ষা করতে এবং তাকে সুস্থ করে তুলতে সমাজের হৃদয়বান মানুষের সাহায্য চাই।”*

পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে শঙ্কা
যিহোবা যিরি ব্যাপ্টিস্ট মিশনের হোস্টেল সুপার দুসাজন ত্রিপুরা জানান, আহত অপর শিক্ষার্থী হেনা এখন অনেকটাই শঙ্কামুক্ত। তবে সাবিত্রীর শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত জটিল। আসন্ন নভেম্বর ও ডিসেম্বরে তার বার্ষিক ও নির্বাচনী পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সে আদৌ পরীক্ষায় বসতে পারবে কি না, তা নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

সাঙ্গু নদে বাড়ছে ঝুঁকি, চালকদের নেই প্রশিক্ষণ
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও পর্যটকদের অভিযোগ, থানচিতে পর্যটনের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে ইঞ্জিনচালিত নৌকার সংখ্যা বাড়লেও বাড়ছে অদক্ষ ও অপ্রাপ্তবয়স্ক চালকদের দৌরাত্ম্য।

স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা মংএনু মারমা ও শৈবাথোয়াই মারমা বলেন, বিপজ্জনক বাঁক অতিক্রম কিংবা নৌযান পরিচালনার জন্য চালকদের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা কারিগরি প্রশিক্ষণ নেই। ফলে প্রায়ই ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটছে। এ বিষয়ে প্রশাসনের নিয়মিত তদারকি প্রয়োজন। 

ঢাকা থেকে আসা পর্যটক মো. হারুন রশিদ বলেন, শুষ্ক মৌসুমে সাঙ্গুর পানির গভীরতা কমে গেলে পাথুরে বাঁকগুলো পার হওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। অনভিজ্ঞ চালকদের দ্রুত সরকারি ব্যবস্থাপনায় প্রশিক্ষণের আওতায় আনা এবং লাইসেন্স ছাড়া নৌযান চালানো বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে আরও বড় প্রাণহানি ঘটতে পারে।

পুলিশ প্রশাসনের বক্তব্য
থানচি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কানন সরকার বলেন, “ব্যক্তিগত কাজে বর্তমানে মালুমঘাট হাসপাতালেই অবস্থান করায় আমি সাবিত্রীর চিকিৎসার খোঁজখবর রাখছি। স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান, নৌকার চালক ও মালিক সমিতির নেতাদের সঙ্গে কথা বলে তাদের যথাসাধ্য সহযোগিতার অনুরোধ করেছি। আমরাও ব্যক্তিগতভাবে পাশে দাঁড়াব। তবে এ ঘটনায় কোনো পক্ষ থেকেই থানায় লিখিত অভিযোগ বা মামলা না করায় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি।”

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।