অপহরণের পর মাছের মতো মানুষ বিক্রি

অনলাইন ডেস্কঃ
৮ নভেম্বর, ২০২৬ ২:২৫ পিএম
শেয়ার করুন:
অপহরণের পর মাছের মতো মানুষ বিক্রি

শারীরিক প্রতিবন্ধী তরুণ এনামুল হক কায়েস স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারেন না। টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের একটি মিষ্টির দোকানে কাজ করে টানাপোড়েনের সংসার চালাতেন। হঠাৎ একদিন নিখোঁজ হন তিনি। পরিবারের সদস্যরা সম্ভাব্য সব জায়গায় খোঁজাখুঁজি করেও কোনো হদিস পাননি। প্রায় ১০ দিন পর জানা গেল, সাগরে ভাসমান একটি ট্রলারে কায়েসকে আটকে রাখা হয়েছিল। সেন্টমার্টিন উপকূল থেকে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর উদ্ধার করা ৭৬ জনের মধ্যে ছিলেন তিনিও। কায়েসকে অপহরণ করে পাচারকারীদের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছিল।

কায়েসের এ ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। কক্সবাজারের টেকনাফে এখন অপহরণ ও মানবপাচার যেন একই অপরাধের দুই ধাপে পরিণত হয়েছে। প্রথমে সাধারণ মানুষকে অপহরণ করে পাহাড়ি দুর্গম আস্তানায় নিয়ে আটকে রাখা হয়। এরপর পরিবারের কাছে দাবি করা হয় মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ। সেই মুক্তিপণ আদায় সম্ভব না হলে কিংবা সুযোগ পেলেই ভুক্তভোগীদের তুলে দেওয়া হচ্ছে মানবপাচারকারী দালাল চক্রের হাতে। সেখান থেকেই ইঞ্জিনচালিত ট্রলারে শুরু হয় জীবনের ঝুঁকিপূর্ণ ও অনিশ্চিত সমুদ্রযাত্রা।

শিক্ষার্থীকে কয়েক দফায় বিক্রি!
কায়েসের মতো একই অভিজ্ঞতার শিকার হন টেকনাফ সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী আয়াত উল্লাহ। একদিন বাড়ি থেকে বের হয়ে বাস টার্মিনাল এলাকায় পৌঁছালে কয়েকজন তাকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যায়। এরপর মৌচনী রোহিঙ্গা ক্যাম্পসংলগ্ন পাহাড়ি আস্তানায় আটকে রাখা হয়।

আয়াত উল্লাহ জানায়, তাকে প্রথমে ৩০ হাজার টাকায় এক দালালের কাছে বিক্রি করা হয়। পরবর্তী সময়ে ওই দালাল আরও এক লাখ টাকায় তাকে অন্য একটি চক্রের কাছে হস্তান্তর করে। প্রায় এক মাস পাহাড়ে আটকে রাখার পর বাহারছড়ার কচ্ছপিয়া এলাকা দিয়ে রাতের আঁধারে সাগরে ট্রলারে তুলে দেওয়া হয়। 

সে বলে, *“তিন দিন সাগরে চলার পর বোটের ইঞ্জিন বিকল হয়ে ভেতরে পানি ঢুকতে শুরু করে। মনে হচ্ছিল আমরা আর বাঁচব না। পরে নৌবাহিনী এসে আমাদের উদ্ধার করে।”*

অন্যদিকে, সাবরাং ইউনিয়নের কচুবনিয়া এলাকার মোহাম্মদ সাবেরকে (৩২) চার বছর আগে একইভাবে অপহরণের পর থাইল্যান্ড হয়ে মালয়েশিয়ায় পাচার করা হয়েছিল। অমানুষিক নির্যাতনের ক্ষত নিয়ে ২০২৪ সালের অক্টোবরে তিনি দেশে ফেরেন। নির্যাতনের কারণে তাঁর মাথা ও চোখের দৃষ্টিশক্তি স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া টেকনাফ সদর ইউনিয়নের নেংগুলবিল গ্রামের কৃষক বেলাল মিয়ার মতো অনেকে সাগরে হারিয়ে গেছেন; তাঁদের কোনো হদিস মেলেনি।

সাগর শান্ত হতেই সক্রিয় পাচার চক্র
শীতের শুরুতে সাগর শান্ত হওয়ার সুযোগে টেকনাফ উপকূলে সক্রিয় হয়ে উঠেছে মানবপাচারকারীরা। স্থানীয়দের অভিযোগ, মেরিন ড্রাইভের প্রায় ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ অরক্ষিত উপকূল, পাহাড়ি আস্তানা এবং হোয়াইক্যং, হ্নীলা, বাহারছড়া ও শাহপরীর দ্বীপের দুর্গম এলাকাকে ব্যবহার করে পাচার কার্যক্রম চলছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাপক তৎপরতা শুরু করেছে। গত এক সপ্তাহে উপকূলীয় বিভিন্ন এলাকা থেকে সাগরপথে পাচারের সময় দেড় শতাধিক মানুষকে উদ্ধার এবং অন্তত ১৫ জন দালালকে আটক করা হয়েছে। 

সম্প্রতি সেন্টমার্টিনের কাছাকাছি সমুদ্র এলাকা থেকে ১১ দালালসহ ৭৬ জনকে উদ্ধার করে নৌবাহিনী। এছাড়া রাজারছড়ার পাহাড়ি এলাকায় অভিযান চালিয়ে পাচারকারীদের ২০টি অস্থায়ী আস্তানা গুঁড়িয়ে দেয় বিজিবি ও পুলিশ।

বাহারছড়া ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য ফরিদ উল্লাহ জানান, সাগর শান্ত থাকায় উপকূলের বিভিন্ন আস্তানায় জড়ো করে রাখা অনেক মানুষকে ইতিমধ্যে উদ্ধার করা হয়েছে। ভুক্তভোগীদের অধিকাংশই জানিয়েছেন, তাঁদের কাজ দেওয়ার কথা বলে নয়, বরং সরাসরি অপহরণ করে জোরপূর্বক ট্রলারে তোলা হয়েছিল।

বিচারহীনতা ও আইনি দীর্ঘসূত্রতা
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্যমতে, ২০১৬ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত কক্সবাজার উপকূল দিয়ে সাগরপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার সময় ৩ হাজার ৫৩৪ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। এসব ঘটনায় উখিয়া ও টেকনাফ থানায় ১২০টির বেশি মামলা হয়েছে। এছাড়া গত তিন বছরে টেকনাফে অন্তত ৩৩০ জন অপহরণের শিকার হয়েছেন। 

তবে মানবপাচারের ঘটনায় নিয়মিত মামলা হলেও বিচারপ্রক্রিয়ার গতি অত্যন্ত ধীর। কক্সবাজার জেলা পুলিশ ও জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত জেলায় দায়ের হওয়া ৬০০টির বেশি মানবপাচার মামলার মধ্যে প্রায় ৪৮০টি এখনো বিচারাধীন।

বাংলাদেশ ন্যাশনাল উইমেন লইয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএনডব্লিউএলএ) আইনজীবী বিশ্বজিৎ ভৌমিক জানান, কক্সবাজার অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ জেলা হওয়া সত্ত্বেও সেখানে এখনো পৃথক ‘মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ট্রাইব্যুনাল’ গঠিত হয়নি। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে এসব মামলা পরিচালিত হওয়ায় এবং সাক্ষীদের নিয়মিত অনুপস্থিতির কারণে বিচারকাজ বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। ফলে অপরাধীরা সহজেই জামিন পেয়ে আবারও একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।

প্রয়োজন সমন্বিত কঠোর পদক্ষেপ
ব্র্যাকের মাইগ্রেশন কর্মসূচির সহযোগী পরিচালক শরিফুল ইসলাম হাসান বলেন, “পাচারকারীরা কৌশল বদলে এখন প্রলোভনের পাশাপাশি সরাসরি অপহরণের আশ্রয় নিচ্ছে। মানবপাচার, মাদক ব্যবসা এবং হুন্ডি চক্র একে অপরের সঙ্গে জড়িত। শুধু মাঠপর্যায়ের দালাল ধরলে হবে না; সব সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে এই নেটওয়ার্কের মূল হোতাদের আইনের আওতায় আনতে হবে।”

কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো. অহিদুর রহমান জানান, অপহরণ ও মানবপাচারের গভীর সংযোগ খতিয়ে দেখে নিয়মিত অভিযান এবং গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। তবে এই সংকট স্থায়ীভাবে সমাধানের জন্য সামাজিক সচেতনতা ও সমন্বিত প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।

উপকূলের ঘাটে অভিযান চালিয়ে সাময়িকভাবে কিছু দালাল আটক করলেই এ সংকটের স্থায়ী সমাধান হবে না। পাচারকারী চক্রের মূল অর্থদাতা ও হোতাদের চিহ্নিত করা, অরক্ষিত সীমানায় সার্বক্ষণিক নজরদারি এবং বছরের পর বছর ঝুলে থাকা মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি নিশ্চিত করাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।