৫৫ বছরেও স্থায়ী সেতু হয়নি থানচির পর্দ্দাঝিড়িতে; জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল শিক্ষার্থী ও পর্যটকদের

অনুপম মারমা, থানচি প্রতিনিধি, বান্দরবানঃ
৪ নভেম্বর, ২০২৬ ৭:০৭ পিএম
শেয়ার করুন:
৫৫ বছরেও স্থায়ী সেতু হয়নি থানচির পর্দ্দাঝিড়িতে; জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল শিক্ষার্থী ও পর্যটকদের

বান্দরবানের থানচি উপজেলার তিন্দু ইউনিয়নের দুর্গম পর্দ্দাঝিড়ির মুখে স্বাধীনতার ৫৫ বছরেও নির্মিত হয়নি কোনো স্থায়ী সেতু। ফলে প্রতিবছর বর্ষায় উত্তাল নদী পারাপারে ডিঙি নৌকা এবং শুকনো মৌসুমে স্থানীয় বাসিন্দাদের স্বেচ্ছাশ্রমে তৈরি বাঁশের সাঁকোই হয়ে ওঠে আশপাশের ১৫ থেকে ১৬টি গ্রামের মানুষের একমাত্র ভরসা। গভীর পানির খুমের ওপর নির্মিত এই নড়বড়ে সাঁকো দিয়ে প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করছেন শত শত গ্রামবাসী, শিক্ষার্থী এবং দূর-দূরান্ত থেকে আসা পর্যটকেরা। দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয়রা একটি টেকসই ঝুলন্ত সেতুর দাবি জানালেও জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কাছ থেকে কেবল আশ্বাসই মিলেছে, বাস্তবায়ন হয়নি।

সরেজমিনে দেখা যায়, তিন্দু ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের পর্দ্দাঝিড়ির মুখে দুই পাশে দাঁড়িয়ে আছে সুউচ্চ পাথুরে পাহাড়, আর মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে প্রায় ৪০০ ফুট দীর্ঘ গভীর পানির খুম—যা স্থানীয়ভাবে ‘পদ্মমুখ’ বা ‘পদ্মঝিড়ি’ নামে পরিচিত। দুর্গম এই পথে যাতায়াতের জন্য বছরের তিন মাস ইঞ্জিনচালিত নৌকা এবং বাকি নয় মাস স্থানীয়দের তৈরি বাঁশের সাঁকোই একমাত্র উপায়। 

ঝুঁকিপূর্ণ এই পথ দিয়ে প্রতিদিন থাংলং ম্রো পাড়া, অংথোয়াইপ্রু পাড়া, রুনাজন পাড়া, জিন্না পাড়া ও সত্যমনি পাড়াসহ অন্তত ১৫টি গ্রামের প্রায় পাঁচ শতাধিক মানুষ চলাচল করেন। পাশাপাশি দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র অমিয়াখুম, বেলাখুম ও রেমাক্রীমুখী পর্যটকদেরও এই বিপজ্জনক সাঁকো মাড়িয়ে যেতে হয়।

রুনাজন পাড়ার কারবারি (পাড়াপ্রধান) সুজন ত্রিপুরা আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, “প্রতিবছর গ্রামবাসীরা নিজেদের টাকা ও পরিশ্রমে এই বাঁশের সাঁকো তৈরি করি। শিক্ষার্থী, বয়োবৃদ্ধ, অসুস্থ রোগী ও পর্যটক—সবাইকে এই বাঁশের ওপর দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে পার হতে হয়। গত ১৫ বছর ধরে বিভিন্ন জনপ্রতিনিধি লোহার অ্যাঙ্গেল দিয়ে একটি স্থায়ী ঝুলন্ত সেতু করে দেওয়ার আশ্বাস দিচ্ছেন, কিন্তু আজ পর্যন্ত কারও দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয়নি।”

পারাপারের ঝুঁকি কতটা মারাত্মক, তা স্মরণ করিয়ে দিয়ে সত্যমনি ত্রিপুরা পাড়ার বাসিন্দা খুবাইতি ত্রিপুরা বলেন, “গত বর্ষা মৌসুমে প্রবল স্রোতের তোড়ে সাঁকো পার হতে গিয়ে পানিতে ডুবে দুই শিক্ষার্থীর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। এত বড় দুর্ঘটনার পরও নিরাপদ যাতায়াতের কোনো স্থায়ী উদ্যোগ না থাকায় আমরা সারাক্ষণ আতঙ্ক আর উদ্বেগের মধ্যে থাকি।”

৪ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য উহ্লামং মারমা জানান, পর্দ্দাঝিড়ির ওপারে বিস্তীর্ণ জনপদ ছাড়াও রয়েছে বেশ কয়েকটি পর্যটনকেন্দ্র। শুধু পর্যটন নয়—শিশুদের নিয়মিত বিদ্যালয়ে যাতায়াত, মুমূর্ষু রোগীকে হাসপাতালে নেওয়া, নিত্যপ্রয়োজনীয় মালামাল আনা-নেওয়া এবং জুমচাষিদের উৎপাদিত কৃষিপণ্য বাজারে পৌঁছানোর একমাত্র পথ এটি। তিনি বলেন, “জনগণের এই দুর্ভোগ লাঘবে নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই পরিষদের মাধ্যমে লোহার ঝুলন্ত সেতু নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসছি, কিন্তু সরকারি তহবিল সংকটের কারণে এখনো কোনো ফলাফল আসেনি।”

এ বিষয়ে তিন্দু ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ভাগ্যচন্দ্র ত্রিপুরা বলেন, “ইউনিয়ন পরিষদের নিয়মিত প্রকল্প (টিআর, কাবিখা বা এলজিএসপি) দিয়ে এত বড় অবকাঠামো তৈরি করা নীতিগতভাবে সম্ভব নয়। তবে দুই পাথুরে পাহাড়ের ওপর ভিত্তি করে লোহার অ্যাঙ্গেল দিয়ে একটি দীর্ঘস্থায়ী ঝুলন্ত সেতু নির্মাণ করা খুব বেশি ব্যয়বহুল হবে না; এতে আনুমানিক ১০ থেকে ২০ লাখ টাকা লাগতে পারে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) চাইলে সহজেই এটি বাস্তবায়ন করতে পারে। আমরা প্রশাসনের কাছে লিখিতভাবে আবেদন জানিয়েছি।”

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) থানচি উপজেলার অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলী মো. আবু হানিফ বলেন, “পর্দ্দাঝিড়ির ভৌগোলিক পরিস্থিতি বিবেচনায় সেখানে সম্পূর্ণ লোহার কাঠামো ব্যবহার করে একটি আধুনিক ঝুলন্ত সেতু নির্মাণ করা পুরোপুরি সম্ভব। দ্রুতই সহকারী প্রকৌশলী পাঠিয়ে একটি টেকনিক্যাল প্রতিবেদন তৈরি করা হবে এবং আমিও নিজে সরেজমিন পরিদর্শন করব। স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রকল্প প্রস্তাবনাটি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে। বরাদ্দ মিললেই সেতু নির্মাণের কাজ শুরু করা যাবে।”

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।