৭১ পেরিয়ে ৭২-এ পদার্পণ: স্মৃতির আকাশে আজও দীপ্ত ‘স্লোগানের কবি’ নাজমুল হক নজীর

কবির হোসেন, আলফাডাঙ্গা প্রতিনিধি, ফরিদপুরঃ
২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১১:২৩ এএম
শেয়ার করুন:
৭১ পেরিয়ে ৭২-এ পদার্পণ: স্মৃতির আকাশে আজও দীপ্ত ‘স্লোগানের কবি’ নাজমুল হক নজীর

কিছু নাম কেবল সাধারণ কোনো পরিচয় নয়, হয়ে ওঠে একটি সময়ের অবিনাশী স্বাক্ষর। কিছু মানুষ দেহাবসানে চলে যান দূরলোকে, কিন্তু তাঁদের উচ্চারণ চিরকালের মতো স্থায়ী আসন গড়ে নেয় মানুষের হৃদয়ে। কবি ও সাংবাদিক নাজমুল হক নজীর তেমনই এক অনন্য ব্যক্তিত্ব—যাঁর কলমে প্রতিবাদের লেলিহান শিখা যেমন জ্বলেছে, তেমনি স্নিগ্ধ আলো ছড়িয়েছে প্রেম, প্রকৃতি, স্বপ্ন ও গভীর মানবপ্রেম। নশ্বর পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে তিনি আজ চোখের আড়ালে, কিন্তু কবিতার প্রতিটি পঙ্‌ক্তিতে স্মৃতির আকাশে তিনি এখনো অমলিন ও দীপ্তিময়।

আজ ২৫ সেপ্টেম্বর, কবি নাজমুল হক নজীরের শুভ জন্মদিন। জীবদ্দশায় থাকলে আজ তিনি ৭১ বছর পূর্ণ করে পদার্পণ করতেন ৭২ বছরে। কবির প্রকৃত বয়স কি কেবল ক্যালেন্ডারের পাতায় সীমাবদ্ধ? তাঁর বয়স ছড়িয়ে আছে তাঁর কবিতার অক্ষরে, অনুরাগীদের স্মৃতির অলিন্দে, সময়ের বুকের ভাঁজে এবং একটি বৈষম্যহীন সুন্দর সমাজের জন্য রেখে যাওয়া আজন্ম লালিত স্বপ্নে।

কবির নামটির গভীরেই যেন প্রোথিত ছিল তাঁর সৃষ্টির মহিমা। ‘নাজমুল’ শব্দের অর্থ নক্ষত্রতুল্য বা দীপ্তিমান; ‘হক’ শব্দের অর্থ সত্য, ন্যায় ও অধিকার; আর ‘নজীর’ অর্থ দৃষ্টান্ত। নামের সেই প্রতীকী ব্যঞ্জনাকে ধারণ করেই সত্য ও ন্যায়ের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে তিনি বাংলা সাহিত্যে নিজেই এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন।

১৯৫৫ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা উপজেলার শিয়ালদী গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন নাজমুল হক নজীর। তাঁর পিতা মরহুম বজলার রহমান মোল্যা ও মাতা মরহুমা আছিরন নেছা। সত্তরের দশক থেকে বাংলা কবিতায় নিজস্ব ভাব, ভাষা ও স্বরে তিনি আলাদা একটি পথ নির্মাণ করেন। কৈশোরে মহান মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতা তাঁর জীবন ও শিল্পচেতনাকে গভীরভাবে আলোড়িত করেছিল। ফলে মুক্তিযুদ্ধ, দেশপ্রেম এবং সময়ের দায়বোধ হয়ে ওঠে তাঁর সাহিত্যের মূল উপজীব্য। 

বাংলা সাহিত্যজগতে তিনি সুপরিচিত ছিলেন ‘স্লোগানের কবি’ হিসেবে। তবে কেবল এই একটি পরিচয়ে তাঁর বিস্তৃত কবিসত্তাকে ধারণ করা যায় না। অন্যায়ের বিরুদ্ধে রাজপথ কাঁপানো স্লোগানের পাশাপাশি তাঁর কবিতায় ছিল মধ্যবিত্তের জীবনের চালচিত্র, মানবিক মর্যাদা, দুঃখ-বেদনা ও প্রকৃতির মুগ্ধ রূপ। তাঁর কালজয়ী বহু উচ্চারণ পাঠককে নতুন করে ভাবতে শেখায়—

*“আমি তো আমারেই চিনি না*  
*আঁধারে রয়েছো তুমি…”*  

কিংবা মানুষের বিভক্ত ও অস্থির সমাজের দিকে তাকিয়ে তিনি লিখেছিলেন—  
*“মানুষে মানুষে বড় কোলাহল*  
*পৃথিবীটা রণভূমি।”*

পেশাগত জীবনে তিনি ছিলেন সাংবাদিক। সাংবাদিকতার তীব্র পর্যবেক্ষণে তিনি সমাজের অসংগতিকে প্রত্যক্ষ করেছেন, আর কবিহৃদয় দিয়ে সেই বাস্তবতাকে রূপ দিয়েছেন শৈল্পিক ভাষায়। জীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যেও তিনি লিখে গেছেন অবিরাম। ‘স্বপ্ন পোড়ালে কখনো ছাই হয় না’—এই অটল বিশ্বাস ধারণ করে আমৃত্যু তিনি সৃষ্টির সাধনা করে গেছেন।

তাঁর প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘সাধনার ফসল’, ‘আবার স্লোগান’সহ বহু গ্রন্থ। ছোটদের জন্য তিনি রচনা করেছেন চমৎকার সব ছড়ার বই। সাহিত্য ও সাংবাদিকতায় অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ জীবদ্দশায় তিনি ভূষিত হয়েছেন একাধিক সাহিত্য পুরস্কার ও সম্মাননায়।

২০১৫ সালের ২৩ নভেম্বর রাজধানী ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই কলমযোদ্ধা। তবে শারীরিক মৃত্যু তাঁর সৃষ্টির দ্যুতিকে ম্লান করতে পারেনি। আলফাডাঙ্গার শিয়ালদীর মাটি থেকে উঠে এসে বাংলা কবিতার বিস্তৃত দিগন্তে যে আলো তিনি জ্বেলে গেছেন, তা আজও অম্লান। ৭১ পেরিয়ে বাহাত্তরে পদার্পণের এই পুণ্যলগ্নে ক্ষণজন্মা এই কবিকে আলফাডাঙ্গাবাসীসহ বাংলা সাহিত্যের পাঠকমহল স্মরণ করছে গভীর শ্রদ্ধা ও পরম ভালোবাসায়।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।