৮৭ টাকার মাল্টা কেন বাজারে এসে ৫২০ টাকা হয়ে যায়?

অনলাইন ডেস্কঃ
১ অক্টোবর, ২০২৬ ৫:৫১ পিএম
শেয়ার করুন:
৮৭ টাকার মাল্টা কেন বাজারে এসে ৫২০ টাকা হয়ে যায়?

দক্ষিণ আফ্রিকা ও মিসর থেকে দেশে আমদানি করা প্রতি কেজি মাল্টার গড় ক্রয়মূল্য মাত্র ৮৭ টাকা। তবে হাতবদল হয়ে চট্টগ্রামের খুচরা বাজারে পৌঁছাতে সেই মাল্টাই বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ৪৮০ থেকে ৫২০ টাকায়। অর্থাৎ আমদানি মূল্যের চেয়ে অন্তত পাঁচ থেকে ছয় গুণ বেশি দামে ফলটি কিনতে বাধ্য হচ্ছেন সাধারণ ভোক্তারা।

বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মাল্টার আকাশছোঁয়া দামের পেছনে প্রধান ভূমিকা রাখছে অতিরিক্ত শুল্ক-কর। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পরিবহন ব্যয়, ফল নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি, আমদানি হ্রাস এবং ডেঙ্গু পরিস্থিতির কারণে সাম্প্রতিক সময়ে হঠাৎ তৈরি হওয়া বাড়তি চাহিদা।

শুল্কের বোঝায় শুরুতেই দ্বিগুণ দাম
বাংলাদেশ কাস্টমসের তথ্যমতে, বর্তমানে কমলা ও মাল্টাজাতীয় তাজা ফল আমদানির ওপর মোট করভার ১২১ দশমিক ৭৮ শতাংশ। এর মধ্যে আমদানি শুল্ক ছাড়াও রয়েছে নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক, মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) এবং অগ্রিম আয়কর।

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের হিসাব অনুযায়ী:
আমদানি মূল্য: কেজিপ্রতি প্রায় ৮৭ টাকা।
শুল্ক-কর: কেজিপ্রতি প্রায় ১০৭ টাকা।
বন্দর খালাস ব্যয়: শুল্ক পরিশোধের পর প্রতি কেজির ব্যয় দাঁড়ায় ১৯৩ থেকে ১৯৪ টাকা।

এরপর হিমায়িত কনটেইনারের ভাড়া, বন্দর থেকে আড়তে নেওয়া ও অভ্যন্তরীণ পরিবহন বাবদ কেজিতে আরও ১০ থেকে ১৫ টাকা ব্যয় হয়। আমদানিকারকদের দাবি, ফল পচনশীল হওয়ায় নষ্ট হওয়ার ক্ষতি এবং বন্দরের অতিরিক্ত মাশুল মিলিয়ে তাঁদের প্রকৃত ব্যয় দাঁড়ায় কেজিপ্রতি ২৩০ থেকে ২৪০ টাকা পর্যন্ত। 

ধারাবাহিক পতনে মাল্টা আমদানি
উচ্চ শুল্ক আরোপের পর থেকে দেশে ফল আমদানিতে বড় ধরনের ধস নেমেছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় দেখা যায়—
২০২১-২২ অর্থবছর: আমদানি হয় ২ লাখ ৯৪ হাজার টন।
২০২২-২৩ অর্থবছর: আমদানি কমে দাঁড়ায় ২ লাখ ২০ হাজার টনে।
২০২৩-২৪ অর্থবছর: নেমে আসে ১ লাখ ৭৩ হাজার টনে।
২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছর: আমদানি হয় যথাক্রমে ১ লাখ ৬৮ হাজার ও ১ লাখ ৫৩ হাজার টন।

মাত্র চার বছরের ব্যবধানে দেশে ফলটির আমদানি প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। এমনকি চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে মাল্টা এসেছে মাত্র ২১ হাজার টন।

পাইকারি থেকে খুচরায় আকাশছোঁয়া ফারাক
বন্দর থেকে খালাসের পর মাল্টা যায় ঢাকা ও চট্টগ্রামের বড় পাইকারি বাজারে। ব্যবসায়ীরা জানান, মাত্র তিন সপ্তাহ আগেও পাইকারিতে মাল্টা কেজিপ্রতি ২২০ থেকে ২২৩ টাকায় বিক্রি হয়েছে। তবে সরবরাহ কম থাকায় হঠাৎ দাম লাফিয়ে বাড়ে।

একপর্যায়ে ১৫ কেজির এক কার্টন মাল্টা বিক্রি হয় ৬ হাজার থেকে সাড়ে ৭ হাজার টাকায়; অর্থাৎ পাইকারিতেই কেজিপ্রতি দাম দাঁড়ায় ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা। আর খুচরা বাজারে পৌঁছাতে তা রূপ নেয় ৪৮০ থেকে ৫২০ টাকায়।

আমদানিকারকদের দাবি, কিছু ক্ষেত্রে পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতারা অস্বাভাবিক মুনাফা করায় ভোক্তা পর্যায়ে কেজিপ্রতি অতিরিক্ত প্রায় ১০০ টাকা পর্যন্ত দাম বাড়ছে।

ফলের ওপর আরোপিত করের ইতিহাস
২০২১-২২ অর্থবছরে মাল্টাসহ বিভিন্ন ফলের ওপর মোট করভার ছিল প্রায় ৮৯ শতাংশ। পরবর্তী সময়ে ডলার-সংকটের সময় বিলাসপণ্য হিসেবে আমদানি নিরুৎসাহিত করতে ২০২২ সালের মে মাসে অতিরিক্ত ২০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক বসানো হয়। একপর্যায়ে এই করভার বেড়ে ১৩৬ দশমিক ২০ শতাংশ পর্যন্ত উঠেছিল। বর্তমানে কিছুটা কমে তা ১২১ দশমিক ৭৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম না বাড়লেও শুধু এই উচ্চ কর কাঠামোর কারণেই দেশে ফলটির ভিত্তিমূল্য দ্বিগুণ হয়ে যায়।

ডেঙ্গু পরিস্থিতি ও বাড়তি চাহিদা

মাল্টার দাম বাড়ার সময়ে দেশে ডেঙ্গু রোগের প্রকোপ মারাত্মক আকার ধারণ করে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলতি বছরে ৭৯ হাজার ৬২০ জন ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং মারা গেছেন ২৪৫ জন। বিশেষ করে সেপ্টেম্বর মাসে রোগীর সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বাড়ে। ডেঙ্গু ও জ্বরে আক্রান্ত রোগীদের জন্য ভিটামিন-সি সমৃদ্ধ সাইট্রাস ফলের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং বাজারে সরবরাহ ঘাটতি থাকায় বিক্রেতারা অতিরিক্ত দাম হাঁকানোর সুযোগ নেন।

ভোক্তা অধিকারের পদক্ষেপ
ফলের বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যের বিষয়ে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম বিভাগ তৎপরতা শুরু করেছে। ভোক্তা অধিকারের কর্মকর্তারা চট্টগ্রামের ফলমন্ডিতে অভিযান চালিয়ে অনিয়মের দায়ে তিনটি প্রতিষ্ঠানকে মোট ১৩ হাজার টাকা জরিমানা করেন। বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক ও সহনীয় রাখতে এই ধরনের নজরদারি ও অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।