জার্মান ফুটবলে উগ্রপন্থার ছায়া, ব্যানার টাঙিয়ে গুলির হুমকি

অনলাইন ডেস্কঃ
৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১:৩৭ পিএম
শেয়ার করুন:
জার্মান ফুটবলে উগ্রপন্থার ছায়া, ব্যানার টাঙিয়ে গুলির হুমকি

প্রিয় ফুটবল দলের ম্যাচ দেখে মাঠ থেকে বের হতেই স্টেফান আর-এর (নিরাপত্তার স্বার্থে ছদ্মনাম) পথ আটকে দাঁড়ান কালো পোশাক পরা সুঠামদেহী এক ব্যক্তি। শক্ত করে হাত চেপে ধরার পর পেছন থেকে এগিয়ে আসেন আরও অন্তত দুজন। মুহূর্তেই তাঁকে ঘিরে ফেলে দলবদ্ধ উগ্রপন্থীরা। এরপর সরাসরি বুকে গুলি করার হুমকি দিয়ে নির্দেশ দেওয়া হয়—অনতিবিলম্বে শহর ছেড়ে চলে যেতে হবে।

ঘটনাটি ২০১৯ সালের গ্রীষ্মের হলেও জার্মানির ফুটবল অঙ্গনে এর রেশ কাটেনি আজও। জার্মান কাপের ম্যাচে সেদিন হামবুর্গের মুখোমুখি হয়েছিল চতুর্থ স্তরের ক্লাব কেমনিৎসার এফসি। ক্লাবের মাঠ গেলার্টশ্ট্রাসের গ্যালারিতে রংধনু রঙে বৈচিত্র্য, সহনশীলতা ও বিশ্বজনীনতার বার্তা সংবলিত একটি ব্যানার টাঙিয়েছিলেন স্টেফান। আর এই ব্যানারই কাল হয়ে দাঁড়ায় তাঁর জন্য। হুমকির মুখে স্টেফান পরে জানতে পারেন, হামলাকারীরাও ছিলেন একই ক্লাবের কট্টর উগ্র ডানপন্থী সমর্থক।

গ্যালারিজুড়ে উগ্রবাদের দৌরাত্ম্য
কেমনিৎসারের উগ্র ডানপন্থী সমর্থকেরা সংখ্যায় খুব বেশি না হলেও স্থানীয় বক্সিং ও মিশ্র মার্শাল আর্ট (এমএমএ) মহলের সঙ্গে তাঁদের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। ফলে সাধারণ সমর্থকদের মধ্যে তৈরি হয়েছে চরম ভীতি। 

এই ক্লাবের উগ্রবাদের শিকড় কতটা গভীরে, তার প্রমাণ মিলেছিল ২০১৯ সালে। টমাস হালার নামের এক স্বঘোষিত নব্যনাৎসি ও হুলিগ্যান ক্যানসারে মারা যাওয়ার পর ক্লাবের মাঠেই তাঁর স্মরণসভার আয়োজন করা হয়। কালো পোশাক ও জ্বলন্ত ফ্লেয়ার হাতে গ্যালারি দখল করে নব্যনাৎসিরা। এমনকি মাঠে হালারের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ঘোষক বলেছিলেন, “তিনি ক্লাবের জন্যই বেঁচেছিলেন।” অথচ নব্বইয়ের দশকে হালার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘হুনারা’ নামের সমর্থকগোষ্ঠী, যার নামের অর্থই ছিল—হুলিগ্যান, নাৎসি ও বর্ণবাদী।

একই সময়ে ক্লাবের অধিনায়ক ডানিয়েল ফ্রান একটি গোল উদ্‌যাপনের সময় স্থানীয় হুলিগ্যানদের সমর্থনে টি-শার্ট প্রদর্শন করায় সমালোচনার মুখে পড়েন। পরে উগ্রপন্থীদের সঙ্গে সম্পর্কের অভিযোগে ক্লাব তাঁর সঙ্গে চুক্তি বাতিল করে।

রাজনীতির মেরুকরণ ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
জার্মান ফুটবলে রাজনীতির প্রভাব দীর্ঘদিনের। সেন্ট পাওলির মতো ক্লাবগুলো যেখানে চরম বামপন্থী ও ফ্যাসিবাদবিরোধী আদর্শের জন্য বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত, সেখানে কিছু ক্লাবের গ্যালারিতে ঐতিহাসিকভাবেই ডানপন্থীদের আধিপত্য রয়েছে। 

ইতিহাসবিদদের মতে, এই বিভাজনের পেছনে রয়েছে পূর্ব জার্মানির অতীত বঞ্চনা। বার্লিন প্রাচীর পতনের পর ১৯৯১ সালে দুই জার্মানির ফুটবল একীভূত হলেও পূর্বের ক্লাবগুলো অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায় টিকতে পারেনি। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়া ও ব্যাপক বেকারত্বের হতাশা থেকেই অনেক পূর্ব জার্মানের মধ্যে অভিবাসীবিরোধী ও কট্টর জাতীয়তাবাদী মনোভাবের বিকাশ ঘটে, যার প্রত্যক্ষ প্রতিফলন পড়ে ফুটবল গ্যালারিতে।

সাম্প্রতিক সময়ে অতি-ডানপন্থী রাজনৈতিক দল ‘অলটারনেটিভ ফর জার্মানি’র (AfD) জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ফুটবল মাঠেও উগ্রপন্থীদের সক্রিয়তা বেড়েছে। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে কেমনিৎসার ও এনার্গি কটবুসের ম্যাচে রূপান্তরকামী (ট্রান্সজেন্ডার) মানুষদের ব্যঙ্গ করে কুরুচিপূর্ণ ব্যানার টাঙানো হয়, যাকে পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ্য সমর্থন দেন এএফডির নেতারা।

প্রতিরোধের লড়াই: বাবেলসবের্গ ও মূলধারার অবস্থান
উগ্রপন্থার এই বিষবাষ্পের বিপরীতে শক্ত অবস্থানও রয়েছে জার্মান ফুটবলে। বার্লিনের কাছে পটসডামের ক্লাব ‘এসভি বাবেলসবের্গ ০৩’ তাদের ফ্যাসিবাদবিরোধী ও শরণার্থী-বান্ধব নীতির জন্য সুপরিচিত। বিতর্কিত অতীত পেরিয়ে ডানিয়েল ফ্রান পরবর্তীতে এই বাবেলসবের্গেই যোগ দেন এবং দলের অধিনায়ক হিসেবে আদর্শিক পুনর্মিলনের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।

একইভাবে বর্ণবাদ ও উগ্র ডানপন্থার বিরুদ্ধে সরব হয়েছে দেশটির সবচেয়ে সফল ক্লাব বায়ার্ন মিউনিখও। ক্লাবের সম্মানসূচক সভাপতি উলি হোয়েনেস থেকে শুরু করে সাবেক কোচ টমাস টুখেল জার্মানিজুড়ে হওয়া এএফডিবিরোধী বিক্ষোভে প্রকাশ্যে সংহতি জানান। টুখেল স্পষ্টভাবেই বলেছিলেন, “সব ধরনের উগ্রপন্থার বিরুদ্ধে লড়াই নিয়ে কোনো দ্বিধা থাকতে পারে না; জার্মানির ইতিহাস ও বর্তমান প্রেক্ষাপটে ডানপন্থী উগ্রবাদের বিরুদ্ধে তো অবশ্যই।”

অভিবাসী ক্লাবের ট্র্যাজেডি
জার্মানিতে অভিবাসী ফুটবল ক্লাবগুলোর লড়াই আরও পুরোনো। ১৯৭৮ সালে বার্লিনের তুর্কি অভিবাসীদের নিয়ে গড়ে ওঠা ‘তুর্কিয়েমস্পোর’ আশির দশকে দারুণ ফুটবল খেললেও প্রাচীর পতনের পর চরম বর্ণবাদের শিকার হয়। ক্লাবটির সাবেক খেলোয়াড় ও পরবর্তী সময়ের চেয়ারম্যান মুরাত দোয়ান স্মৃতিচারণা করে জানান, পূর্ব অঞ্চলে ম্যাচ খেলতে গেলে তাঁদের দিকে উগ্রপন্থীরা শূকরের কাটা মাথা ও পাথর ছুড়ে মারত।

‘৫০+১’ নিয়ম ও সমর্থকদের দায়বদ্ধতা
জার্মান ফুটবলের বিখ্যাত ‘৫০+১’ নিয়মের কারণে ক্লাবের সিংহভাগ মালিকানা ও ভোটাধিকার সাধারণ সমর্থকদের হাতে থাকে। ফুটবল সাপোর্টার্স ইউরোপের প্রতিনিধি মার্টিন এন্ডেমানের মতে, এই ব্যবস্থার যেমন ভালো দিক আছে, তেমনই ঝুঁকিও আছে। সমর্থকেরা চাইলে যেমন ক্লাবকে বৈচিত্র্য ও মানবিক মূল্যবোধের প্রতীক বানাতে পারেন, তেমনি কট্টরপন্থীরা প্রভাব খাটিয়ে গ্যালারিকে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করতে পারে।

সব মিলিয়ে মাঠের ৯০ মিনিটের ফুটবল ছাপিয়ে জার্মানির গ্যালারিগুলো এখন পরিণত হয়েছে এক গভীর আদর্শিক লড়াইয়ের ময়দানে। সেখানে একদিকে যেমন চলছে মানবিক মূল্যবোধ ও বৈচিত্র্য রক্ষার প্রয়াস, অন্যদিকে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে নব্যনাৎসিবাদ ও উগ্রপন্থার ভয়ংকর হুমকি।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।