খাতা মূল্যায়ন করলেন পিয়ন ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী, নগরকান্দায় অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে গুরুতর অনিয়ম

মিজানুর রহমান, সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টারঃ
১৯ আগস্ট, ২০২৬ ৭:০৯ পিএম
শেয়ার করুন:
খাতা মূল্যায়ন করলেন পিয়ন ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী, নগরকান্দায় অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে গুরুতর অনিয়ম

ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলায় উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি) পরীক্ষার উত্তরপত্র (খাতা) মূল্যায়নে চরম অনিয়ম ও দায়িত্বহীনতার অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট পরীক্ষকের পরিবর্তে বিদ্যালয়ের শিক্ষক, অফিস সহকারী, পিয়ন ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের দিয়ে এইচএসসি পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নের ঘটনা ঘটেছে। প্রতিষ্ঠানের লাইব্রেরি ও কমনরুমে বসে খাতা দেখার এমন একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও তোলপাড় সৃষ্টি হয়।

অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানটি উপজেলার চরযশোরদী ইউনিয়নের দহিসারা গ্রামে অবস্থিত ‘দহিসারা উচ্চ বিদ্যালয় অ্যান্ড কলেজ’ (সাবেক সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী স্কুল অ্যান্ড কলেজ)। প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান অধ্যক্ষ আত্তাপ হোসেন।

স্থানীয় সূত্র ও সংশ্লিষ্টদের বরাতে জানা যায়, ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষার প্রধান পরীক্ষক (হেড এক্সামিনার) হিসেবে ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড থেকে অধ্যক্ষ আত্তাপ হোসেন নিজে ৬০০টি উত্তরপত্র গ্রহণ করেন। এছাড়া বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে নিরীক্ষণের (স্ক্রুটিনি) জন্য তার কাছে পাঠানো হয় আরও খাতা। সব মিলিয়ে প্রায় ২ হাজার ১০৪টি খাতা তার দায়িত্বে ছিল।

নিয়মানুযায়ী সংশ্লিষ্ট বিষয়ের অনুমোদিত পরীক্ষকদেরই এসব উত্তরপত্র মূল্যায়নের কথা থাকলেও অধ্যক্ষ আত্তাপ হোসেন বিধিবহির্ভূতভাবে হাইস্কুলের শিক্ষক, অফিস সহকারী, পিয়ন ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের দিয়ে প্রতিষ্ঠানের লাইব্রেরি ও কমনরুমে বসে খাতাগুলো মূল্যায়ন ও নিরীক্ষণ করান। 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন শিক্ষক ও কর্মচারী জানান, অধ্যক্ষের চাপের মুখে তারা খাতা দেখতে বাধ্য হয়েছেন। তাদের অভিযোগ, খাতা মূল্যায়নের মাধ্যমে অধ্যক্ষ আর্থিকভাবে বড় অঙ্কের লাভবান হওয়ার সুযোগ তৈরি করেছেন। বোর্ড থেকে পাওয়া খাতা মূল্যায়নের সিংহভাগ অর্থ অধ্যক্ষ নিজে আত্মসাৎ করে শিক্ষকদের নামমাত্র সম্মানী প্রদান করেছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে অধ্যক্ষ ও প্রধান পরীক্ষক আত্তাপ হোসেন খাতা অন্য লোক দিয়ে করানোর বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, “আমি হেড এক্সামিনার হিসেবে বোর্ড থেকে ৬০০ খাতা এনেছিলাম। বাকি খাতাগুলো অন্যান্য প্রতিষ্ঠান থেকে নিরীক্ষণের জন্য আমার কাছে আসে। মোট ২ হাজার ১০৪টি খাতা আমি স্কুলের শিক্ষকদের দিয়ে নিরীক্ষণ করিয়েছি।” এ সময় খাতা দেখার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টিও তিনি নিশ্চিত করেন।

এ বিষয়ে নগরকান্দা উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইকবাল হাসান বলেন, “এইচএসসি পরীক্ষার খাতা কোনোভাবেই স্কুলের শিক্ষক বা অন্য সাধারণ কর্মচারীদের দিয়ে মূল্যায়ন কিংবা নিরীক্ষণ করানোর সুযোগ নেই। এটি চরম দায়িত্বহীনতা ও গুরুতর অনিয়ম। বিষয়টি দ্রুত ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

ফরিদপুর জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বিষ্ণু পদ ঘোষাল বলেন, “বোর্ড থেকে যে পরীক্ষক খাতা গ্রহণ করবেন, নিয়ম অনুযায়ী তাকেই তা দেখতে হবে। অন্য কাউকে দিয়ে, বিশেষ করে হাইস্কুলের শিক্ষক বা কর্মচারীদের দিয়ে এইচএসসির খাতা দেখানো স্পষ্টতই অপরাধ। বিষয়টি তদন্ত করে আইনানুগ কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

এদিকে পাবলিক পরীক্ষার খাতা নিয়ে এমন দায়িত্বহীন কাণ্ড সামনে আসার পর স্থানীয় অভিভাবক ও সচেতন মহলে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তারা অবিলম্বে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।