চাষাবাদ ও টিউশনির টাকায় স্কুল টিকিয়ে রেখেছেন রাঙামাটির শিক্ষকরা

অনলাইন ডেস্কঃ
৫ অক্টোবর, ২০২৬ ১১:২৯ এএম
শেয়ার করুন:
চাষাবাদ ও টিউশনির টাকায় স্কুল টিকিয়ে রেখেছেন রাঙামাটির শিক্ষকরা

পাহাড়ের দুর্গম জনপদে শিক্ষার আলো ছড়াতে গিয়ে চরম বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছেন রাঙামাটির শিক্ষকরা। সমতলের তুলনায় পাহাড়ি অঞ্চলের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা এমনিতেই পিছিয়ে, তার ওপর জেলার ১৪৯টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আজ সরকারি সুযোগ-সুবিধা ও স্বীকৃতির অভাবে নামমাত্র অস্তিত্ব নিয়ে টিকে রয়েছে। মানবেতর জীবনযাপন করা এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা নিজেদের বিদ্যালয়ের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে এবং সংসার চালাতে বেছে নিয়েছেন চাষাবাদ, টিউশনি কিংবা দিনমজুরি। রাঙামাটির এই শিক্ষা খাত যেন ‘বাতির নিচেই অন্ধকার’-এর এক নির্মম প্রতিচ্ছবি।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে মোট ৭৯৬টি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে দুই দফায় ৮১টি বিদ্যালয়কে সরকারীকরণ করা হলেও এখনো ১৪৯টি বিদ্যালয় বেসরকারিই থেকে গেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা মৌলিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত।

বিচ্ছিন্ন দ্বীপের একমাত্র ভরসা ‘ফুল কুঁড়ি’
রাঙামাটি পৌরসভার একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ ‘সিলেটি পাড়া’। প্রায় দুই শতাধিক পরিবারের এই জনপদে কোনো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নেই। দুই কিলোমিটারের মধ্যে অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান না থাকায় ২৪ বছর ধরে এলাকার শিশুদের একমাত্র ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘রাগীব রাবেয়া ফুল কুঁড়ি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’। 

দুই শিফটের এই বিদ্যালয়ে একজন প্রধান শিক্ষক ও তিনজন সহকারী শিক্ষক নামমাত্র সম্মানিতে পাঠদান চালিয়ে যাচ্ছেন। ২০২২ সালে দেশে বহু বিদ্যালয় জাতীয়করণ করা হলেও এই প্রতিষ্ঠানটি তালিকায় স্থান পায়নি। দীর্ঘদিনের বঞ্চনা আর চরম আর্থিক অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে এখানকার শিক্ষকদের।

নিজস্ব পকেটের টাকায় স্কুলের খরচ
সদরের ‘বসন্ত নিচু পাড়া বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’-এর প্রধান শিক্ষক প্রমোদ চাকমা জানান, তার স্কুলে ৫২ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। তবে তারা কোনো ধরনের উপবৃত্তি বা সরকারি সুবিধা পায় না। তিনি বলেন, “২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে পার্বত্য জেলা পরিষদের সামান্য দেড় হাজার টাকার সম্মানিটুকুও বন্ধ রয়েছে। এখন সংসার চালাব, নাকি স্কুল বাঁচিয়ে রাখব বুঝতে পারছি না। দ্রুত নজর না দিলে বিদ্যালয়গুলো বন্ধ হয়ে যাবে।”

একই করুণ চিত্র নানিয়ারচরের ‘জুমিয়া পুনর্বাসন বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’-এ। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান শিক্ষক কল্যাণময় তালুকদার জানান, পাঁচজন শিক্ষক পালাক্রমে ক্লাস নেন। জেলা পরিষদের অনুদান বন্ধ থাকায় পরীক্ষার আনুষঙ্গিক খরচসহ বছরে প্রায় ৫০ হাজার টাকা শিক্ষকদের নিজেদের পকেট থেকেই বহন করতে হয়। টিকে থাকার তাগিদে তিনি এখন পতিত জমিতে চাষাবাদ করে সংসার চালাচ্ছেন।

অন্যদিকে বাঘাইছড়ির ‘অদ্বিতি কেজি স্কুল’-এর প্রধান শিক্ষক শাহাদাৎ হোসেন জানান, প্রতিষ্ঠানটি সেনাবাহিনী পরিচালিত হওয়ায় কিছুটা আর্থিক সুবিধা মেলে। তবে বাকি ঘাটতি মেটাতে তাকে নিয়মিত টিউশনি করতে হয়।

বিনা বেতনে পাঠদান ও অপূর্ণ প্রতিশ্রুতি
বাঘাইছড়ির অত্যন্ত দুর্গম এলাকার ‘ত্রিপুরাছড়ি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’-এ ২০০৮ সাল থেকে ৫০ জন শিক্ষার্থীকে বিনা বেতনে পাঠদান করাচ্ছেন পাঁচজন শিক্ষক। প্রধান শিক্ষক ছোটন চাকমা বলেন, “পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সুপারিশ থাকলেও বাস্তবে জাতীয়করণের কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। দুর্গম এলাকার পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর শিশুদের স্বার্থেই এসব বিদ্যালয় অবিলম্বে সরকারি করা উচিত।”

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. কফিল উদ্দিন জানান, বিদ্যালয়গুলো বর্তমানে কেবল বিনামূল্যে সরকারি পাঠ্যবই পেয়ে থাকে, অন্য কোনো আর্থিক বরাদ্দ নেই। তবে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে নতুন করে তথ্য চাওয়া হলে তা পাঠানো হবে।

রাঙামাটি জেলা পরিষদের শিক্ষা বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্য সায়রা চন্দ্রা চাকমা বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকারের সময় শিক্ষকদের সম্মানি দেওয়া সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। নতুন স্কিমের মাধ্যমে এই সম্মানি পুনরায় চালু করতে আমরা মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করছি। পাশাপাশি বিদ্যালয়গুলোকে জাতীয়করণের আওতায় আনার উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে সব সমস্যার সমাধান করা হবে।”

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।