অস্ত্রধারীদের ডেরা থেকে পালাল মাদরাসাছাত্র, নোয়াখালীতে উদ্ধার করলেন আনসার সদস্য

মেহেদী হাসান ইমন, নোবিপ্রবি প্রতিনিধিঃ
৫ অক্টোবর, ২০২৬ ৪:৪৫ পিএম
শেয়ার করুন:
অস্ত্রধারীদের ডেরা থেকে পালাল মাদরাসাছাত্র, নোয়াখালীতে উদ্ধার করলেন আনসার সদস্য

নোয়াখালীর সোনাপুরে অপহরণকারীদের ডেরা থেকে অত্যন্ত সাহসিকতা ও বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে পালিয়ে আসা মো. ইব্রাহিম খলিল ফুয়াদ (১৪) নামের এক মাদরাসাছাত্রকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে। সোমবার (৫ অক্টোবর) ভোরে সোনাপুর এলাকা থেকে তাকে উদ্ধার করেন নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) দায়িত্বরত আনসার সদস্য অভিজিৎ চৌধুরী। পরে সকালে ক্যাম্পাসে নিয়ে শিশুটিকে নিরাপদে তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

উদ্ধার হওয়া ইব্রাহিম লক্ষ্মীপুরের দত্তপাড়া ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের দর্জিপাড়া খান বাড়ির বাসিন্দা সুমন খান ও খালেদা আক্তার দম্পতির ছেলে। সে স্থানীয় খোদাওয়ান্দপুর মুহাম্মাদিয়া (সা.) মাদরাসার শিক্ষার্থী।

ইব্রাহিমের দেওয়া বিবরণ অনুযায়ী, রোববার (৪ অক্টোবর) দুপুরে মাদরাসা ছুটির পর বাড়ি ফেরার পথে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা থেকে তিন ব্যক্তি তাকে ‘বাবু, এদিকে আসো’ বলে ডাক দেয়। এরপর তাকে ৫০ টাকার একটি নোট দিয়ে বলে, টাকা না নিলে তারা কষ্ট পাবে। সরল বিশ্বাসে সে টাকাটি নিলে, চক্রটি তাকে একটি কাগজের টুকরো দেখিয়ে সেখানকার ঠিকানাটি পড়ে দিতে বলে। কাগজটিতে দৃষ্টি দেওয়ার কিছুক্ষণ পরই তার মাথা ঘুরতে শুরু করে এবং সে অচেতন হয়ে পড়ে। এরপরই তাকে তুলে নিয়ে যায় অপহরণকারীরা।

ইব্রাহিম জানায়, রাত আনুমানিক ৯টা থেকে ১০টার দিকে জ্ঞান ফিরলে সে নিজেকে একটি অজ্ঞাত কক্ষের প্লাস্টিকের চেয়ারের সঙ্গে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় দেখতে পায়। ঘরের এক কোণে রাইফেল ও ধারালো চাপাতিসহ বিভিন্ন দেশীয় অস্ত্র দেখে সে আঁতকে ওঠে। যেকোনো মূল্যে সেখান থেকে পালানোর সিদ্ধান্ত নেয় সে।

প্রথম ও দ্বিতীয় দফায় দড়ি আলগা করে পালানোর চেষ্টা চালালে অপহরণকারীরা তা দেখে ফেলে এবং তাকে পুনরায় শক্ত করে বেঁধে রাখে। তবে মনোবল না হারিয়ে ইব্রাহিম তীক্ষ্ণ নজর রাখে অপহরণকারীরা কক্ষের চাবি কোথায় রাখছে। অবশেষে শেষ রাতের দিকে পাহারাদারদের অসচেতনতার সুযোগ নিয়ে সে চাবি দিয়ে তালা খুলে দৌড়ে পালিয়ে যায়। 

টের পেয়ে অপহরণকারীরা তাকে ধাওয়া করলে সে দ্রুত একটি গাছের আড়ালে লুকিয়ে পড়ে আত্মরক্ষা করে। কিছুক্ষণ পর দূর থেকে গাড়ির হর্নের শব্দ শুনে প্রধান সড়কের অবস্থান নিশ্চিত হয়ে সে প্রাণপণে সেদিকে ছুটে যায়।

ভোর সোয়া ৫টার দিকে সোনাপুর রয়্যাল হাসপাতালের কাছাকাছি প্রধান সড়কে পৌঁছায় ইব্রাহিম। ঠিক সেই মুহূর্তে নোবিপ্রবিতে কর্মরত আনসার সদস্য অভিজিৎ চৌধুরী বাস থেকে নেমে রিকশায় চড়ে ক্যাম্পাসে ফিরছিলেন।

সাহসী সেই মুহূর্তের বর্ণনা দিয়ে আনসার সদস্য অভিজিৎ চৌধুরী বলেন, “ভোর ৫টা ১০ মিনিটের দিকে রিকশায় ক্যাম্পাসে যাচ্ছিলাম। রয়্যাল হাসপাতালের কাছাকাছি এলে দেখতে পাই, পাশের একটি গলি থেকে চরম আতঙ্কিত অবস্থায় একটি ছেলে দৌড়ে এসে আমার রিকশার সামনে পড়ে। তার পেছনে কয়েকজন তাকে ধরার জন্য তাড়া করছিল। পরিস্থিতি দেখে আমার সন্দেহ হয়। কালবিলম্ব না করে ছেলেটিকে দ্রুত রিকশায় তুলে ক্যাম্পাসে নিয়ে আসি।”

তিনি আরও বলেন, “ক্যাম্পাসে এনে তাকে অভয় দিয়ে শান্ত করি এবং তার বাবার মুঠোফোন নম্বর সংগ্রহ করে পরিবারকে খবর দিই। সকাল সাড়ে ৭টার দিকে স্বজনরা ক্যাম্পাসে পৌঁছালে তাদের হাতে ছেলেটিকে তুলে দেওয়া হয়।”

ইব্রাহিমের খালাতো বোনের স্বামী মারুফ বলেন, “রোববার দুপুর থেকেই ইব্রাহিম নিখোঁজ ছিল। বহু খোঁজাখুঁজি করেও তাকে পাওয়া যাচ্ছিল না। সকালে জানতে পারি সে নোবিপ্রবির এক আনসার সদস্যের হেফাজতে নিরাপদ আছে। পরে ক্যাম্পাসে গিয়ে আমরা তাকে সুস্থ অবস্থায় নিয়ে আসি।” আইনি পদক্ষেপের বিষয়ে তিনি জানান, পরিবারের সদস্যরা অতিরিক্ত ঝামেলা এড়াতে চাইছেন, তাই এ ঘটনায় এখনো থানায় কোনো সাধারণ ডায়েরি (জিডি) বা মামলা করা হয়নি।

পরিবারের ধারণা, ইব্রাহিমকে অপহরণ করে সোনাপুরের কোনো নির্জন বাড়িতে আটকে রাখা হয়েছিল। 

এদিকে, অস্ত্রধারীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে কিশোরটির দুঃসাহসিক পলায়ন এবং দ্রুততম সময়ে তাকে উদ্ধার করে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ায় আনসার সদস্য অভিজিৎ চৌধুরীর ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করছেন স্থানীয় ও বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে ওই এলাকায় সক্রিয় অপহরণকারী চক্র ও অস্ত্রধারীদের দ্রুত শনাক্ত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।