নগরকান্দায় সারের ডিলারশিপ নিয়ে বিরোধের জেরে হামলা, আহত ৪

শফিকুল ইসলাম জনি, ফরিদপুর প্রতিনিধিঃ
১৩ অক্টোবর, ২০২৬ ৬:৫৫ পিএম
শেয়ার করুন:
নগরকান্দায় সারের ডিলারশিপ নিয়ে বিরোধের জেরে হামলা, আহত ৪

ফরিদপুরের নগরকান্দায় সারের ডিলারশিপ নিয়োগকে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরে প্রতিপক্ষের হামলায় অন্তত চারজন আহত হয়েছেন। ডিলারশিপবঞ্চিত আবেদনকারীদের সংবাদ সম্মেলনের পর এলাকায় সৃষ্ট উত্তেজনা ও পাল্টাপাল্টি অভিযোগের মধ্যেই এ মারামারির ঘটনা ঘটে। আহতদের উদ্ধার করে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

সোমবার (১২ অক্টোবর) সন্ধ্যায় উপজেলার রামনগর ইউনিয়নের বাঙ্গাবাড়িয়া বাজারে এ হামলার ঘটনা ঘটে।

আহত ব্যক্তিরা হলেন—দুলারডাঙ্গী গ্রামের শেখ খোরশেদ আহমেদ দোলন (৫০), উত্তর গোপীনাথপুর গ্রামের সুমন তালুকদার (৩৬), গোপালপুর গ্রামের ওয়াজেদ মোল্যা (৫০) এবং বাড়ৈইডাঙ্গী গ্রামের মোস্তাক আহমেদ কলি মণ্ডল (৫০)। আহতদের মধ্যে খোরশেদ আহমেদ দোলন নিজেকে জেলা যুবদলের সদস্য বলে দাবি করলেও তাঁর সাংগঠনিক পদবির বিষয়টি স্বতন্ত্রভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

আহত দোলনের বড় ভাই শেখ ফরিদ আহমেদ মিলনের অভিযোগ, সার ডিলার নিয়োগে অনিয়মের প্রতিবাদে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়ায় তাঁর ভাইয়ের ওপর পরিকল্পিত হামলা চালানো হয়েছে। তিনি বলেন, “সন্ধ্যায় বাঙ্গাবাড়িয়া বাজারের একটি চায়ের দোকানে বসে ছিল দোলন। এ সময় তুষার মণ্ডলের নেতৃত্বে ২০–২৫ জন সন্ত্রাসী হাতুড়ি ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে তার ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। তাঁকে বাঁচাতে স্থানীয়রা এগিয়ে গেলে আরও তিনজনকে পিটিয়ে রক্তাক্ত করা হয়।” দোলনের মাথায় গুরুতর জখম রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

তবে হামলার অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন মেসার্স এসএস এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী শিবলী সাদিক ওরফে তুষার মণ্ডল। তিনি বলেন, “আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। আমাকে ও আমার পরিবারকে রাজনৈতিকভাবে ঘায়েল করতে এই অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। শুনেছি দোলন এলাকায় অনেকের সঙ্গেই অসদাচরণ ও গালিগালাজ করেছে; হয়তো সেই ক্ষোভ থেকে কারও সঙ্গে মারামারি হতে পারে। এর সঙ্গে আমার বা আমার কোনো লোকের সম্পৃক্ততা নেই।”

এ বিষয়ে নগরকান্দা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রাসুল সামদানী আজাদ জানান, মারামারির খবর পেয়েই পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। হাতুড়ি দিয়ে পেটানোর বিষয়টি এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এ ঘটনায় লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

**বিরোধের নেপথ্যে যা ঘটেছে:**  
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি নগরকান্দা উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে নতুন সার ডিলার নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। রামনগর ইউনিয়নে ডিলারশিপের জন্য শেখ খোরশেদ আহমেদ দোলন এবং একই ইউনিয়নের বিএনপি নেতা মান্নান মণ্ডলের ছেলে শিবলী সাদিক ওরফে তুষার মণ্ডল আবেদন করেন। যাচাই-বাছাই শেষে মেসার্স এসএস এন্টারপ্রাইজের নামে তুষার মণ্ডল ডিলারশিপ পান।

এর পর থেকেই ডিলারশিপবঞ্চিত আবেদনকারীদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দেয়। তাঁরা নিয়োগপ্রক্রিয়ায় স্বজনপ্রীতি, রাজনৈতিক প্রভাব ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ তোলেন। এরই ধারাবাহিকতায় রোববার (১১ অক্টোবর) সকালে নগরকান্দা প্রেসক্লাবে অর্ধশতাধিক বঞ্চিত আবেদনকারী সংবাদ সম্মেলন করেন। সংবাদ সম্মেলনে দোলনের উপস্থিতিতে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন শাহীন মুন্সী। 

লিখিত বক্তব্যে অভিযোগ করা হয়, সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী পর্যাপ্ত যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও প্রকৃত ব্যবসায়ীদের বঞ্চিত করে প্রভাবশালীদের সুপারিশে অনুগতদের ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এমনকি কয়েকটি ইউনিয়নে নিজস্ব গোডাউন না থাকা ব্যক্তিদেরও ভাড়া করা ঘরের ওপর ভিত্তি করে ডিলারশিপ দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হয়। তবে সংবাদ সম্মেলনে অর্থ লেনদেনের কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি।

সংবাদ সম্মেলনে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেজওয়ানা আফরিন, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রেজাউল করিম এবং উপজেলা বিএনপির সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও লস্করদিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান বাবুল তালুকদারের বিরুদ্ধে যোগসাজশের অভিযোগ আনা হয়।

**প্রশাসন ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য:**  
এদিকে নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছে উপজেলা প্রশাসন। নগরকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেজওয়ানা আফরিন বলেন, “আমরা নীতিমালা অনুযায়ী প্রতি ইউনিয়ন থেকে যোগ্য তিন প্রার্থীর তালিকা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। মন্ত্রণালয় যাচাই-বাছাই করে যাঁদের উপযুক্ত মনে করেছে, তাঁদের অনুমোদন দিয়েছে। এখানে কোনো অনিয়ম হয়নি। কারও কাছে দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট প্রমাণ থাকলে তা যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।”

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রেজাউল করিম বলেন, “চার সদস্যের যাচাই-বাছাই কমিটি নিয়মতান্ত্রিকভাবেই যোগ্য প্রার্থীদের তালিকা প্রস্তুত করেছে। এখানে কোনো আর্থিক লেনদেন বা দুর্নীতির সুযোগ ছিল না।”

অভিযোগ প্রসঙ্গে উপজেলা বিএনপির সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হাবিবুর রহমান বাবুল তালুকদার বলেন, “ডিলার নিয়োগের প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে আমার বিন্দুমাত্র সম্পৃক্ততা নেই। সম্মান ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যেই একটি পক্ষ আমার বিরুদ্ধে কাল্পনিক অভিযোগ তুলছে।”

এদিকে পুরো নিয়োগপ্রক্রিয়া নিরপেক্ষভাবে পুনঃতদন্ত এবং অনিয়ম প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন বঞ্চিত প্রার্থীরা।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।