বোয়ালমারী প্রাণিসম্পদ দপ্তরে নানা অনিয়ম: মাঠকর্মীরাই বনে গেছেন ‘ডাক্তার’, প্রকল্পের গাড়ি ব্যক্তিগত ব্যবহারে অভিযোগ

এম এম জামান, বোয়ালমারী প্রতিনিধি, ফরিদপুরঃ
১৩ অক্টোবর, ২০২৬ ৫:১৪ পিএম
শেয়ার করুন:
বোয়ালমারী প্রাণিসম্পদ দপ্তরে নানা অনিয়ম: মাঠকর্মীরাই বনে গেছেন ‘ডাক্তার’, প্রকল্পের গাড়ি ব্যক্তিগত ব্যবহারে অভিযোগ

ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর ও ভেটেরিনারি হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে দায়িত্ব অবহেলা, অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও দাপ্তরিক শৃঙ্খলাভঙ্গের বিস্তর অভিযোগ উঠেছে। সরকারি প্রকল্পের আওতায় মাঠপর্যায়ে গিয়ে প্রান্তিক খামারিদের সেবা ও প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা থাকলেও কর্মীরা এলাকায় না গিয়ে হাসপাতালে বসে পশু চিকিৎসা দিচ্ছেন। এমনকি নিজেদের ‘পশুচিকিৎসক’ হিসেবে পরিচয় দিয়ে ভিজিটিং কার্ড বিতরণ এবং অর্থের বিনিময়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে চিকিৎসা দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।

স্থানীয় খামারিদের অভিযোগ, দুর্গম চরাঞ্চলের হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশুর পরিচর্যার পাশাপাশি খামারিদের প্রশিক্ষিত করার দায়িত্বে থাকা প্রকল্পকর্মীরা নিয়মিত মাঠেই যান না। তাদের কেউ কেউ উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরে বসেই চিকিৎসা দিচ্ছেন, আবার কেউ ব্যক্তিগতভাবে অর্থের বিনিময়ে চিকিৎসাসেবা চালাচ্ছেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সমন্বিত প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ‘লাইভস্টক ফিল্ড ফ্যাসিলিটেটর’ হিসেবে কর্মরত কায়কোবাদ হোসেনের দায়িত্ব উপজেলার ঘোষপুর ইউনিয়নের লংকারচরসহ সংশ্লিষ্ট চরাঞ্চলে। তবে তিনি সেখানে নিয়মিত দায়িত্ব পালন না করে দপ্তরে বসেই গবাদিপশুর চিকিৎসা দেন এবং নিজেকে ‘ডাক্তার’ হিসেবে পরিচয় দেন। তার নামে ‘সকল প্রকার পোষা প্রাণীর ভ্যাকসিন ও চিকিৎসা করা হয়’ লেখা ভিজিটিং কার্ডও হাসপাতালে আসা সেবাগ্রহীতাদের মাঝে বিতরণ করার প্রমাণ রয়েছে। কোনো স্বীকৃত ভেটেরিনারি সনদ না থাকা সত্ত্বেও তিনি সরকারি বরাদ্দের ওষুধ ব্যবহার করে চিকিৎসা করেন এবং ছাগলের বাচ্চার খাসি (ক্যাস্ট্রেশন) করানোর বিনিময়ে সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে ৫০ থেকে ১০০ টাকা করে নেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

একইভাবে ‘প্রাণিপুষ্টির উন্নয়নে উন্নত জাতের ঘাস চাষ সম্প্রসারণ ও লাগসই প্রযুক্তি হস্তান্তর’ প্রকল্পে কর্মরত মো. আলীমুজ্জামান আলীর বিরুদ্ধেও কোনো ডিগ্রি ছাড়াই গত তিন মাস ধরে গবাদিপশুর চিকিৎসা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

অন্যদিকে ময়না ইউনিয়নের চরবর্নি ও মুরালিয়ারচর এলাকায় হাঁস-মুরগি পরিচর্যার দায়িত্বে থাকা আনোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে সরকারি দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি একটি বেসরকারি ভেটেরিনারি কোম্পানিতে বিপণন কর্মকর্তা (মার্কেটিং অফিসার) হিসেবে কাজ করার অভিযোগ উঠেছে। তবে দুটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করার কথা অস্বীকার করে আনোয়ার হোসেন বলেন, “আমি মূলত প্রজেক্টেই কাজ করি। তবে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার (ইউএলও) নির্দেশে হাসপাতালে আসা পশুর চিকিৎসায় সহায়তা করি এবং নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে কিছু চিকিৎসা দিই।”

অভিযোগ রয়েছে হাসপাতালের দাপ্তরিক শৃঙ্খলা নিয়েও। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, সকাল ৯টায় অফিসে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপস্থিতি থাকে অনিয়মিত এবং দুপুর দেড়টার পরই কার্যালয় ফাঁকা হয়ে যায়। এছাড়া ড্রেসার মো. আবুল খায়ের কয়েকমাস আগে অবসরে গেলেও তার নামে বরাদ্দ থাকা হাসপাতালের দোতলার আবাসিক কক্ষে বর্তমানে বসবাস করছেন উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. শওকত আলী।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ফিল্ড ফ্যাসিলিটেটর কায়কোবাদ হোসেন গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন। কোনো চিকিৎসা সনদ ছাড়া চিকিৎসা দেওয়া প্রসঙ্গে বিস্তারিত কথা বলতে অস্বীকৃতি জানিয়ে তিনি বলেন, “আমি কোনো কথা বলব না, স্যারের সঙ্গে কথা বলেন। ইউএলও স্যার যেভাবে বলেন, আমি সেভাবেই চলি। তিনি যদি ঘরে আগুন দিতে বলেন, আমি সেটাই করব।”

এসব বিষয়ে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. শওকত আলী বলেন, “দপ্তরের ১১টি পদের মধ্যে ৮টি পদই শূন্য। চরম জনবলসংকটের কারণেই বাধ্য হয়ে মাঠপর্যায়ের কর্মীদের দিয়ে হাসপাতালের জরুরি কাজ চালাতে হচ্ছে।” 

ক্যাস্ট্রেশনের বিনিময়ে টাকা নেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, “সব হাসপাতালেই ক্যাস্ট্রেশন করলে টাকা দেওয়া-নেওয়ার একটি অলিখিত প্রচলন রয়েছে। সেবাগ্রহীতারা তা স্বেচ্ছায় দেন, তবে আমি নিষেধ করেছি। কায়কোবাদ আগে টাকা নিত, এখন নেয় না।”

ডরমিটরিতে অবস্থানের বিষয়ে তিনি জানান, ওপরের তিনটি কক্ষ খালি পড়ে থাকায় তিনি সাময়িকভাবে সেখানে থাকছেন। 

এদিকে গত ৩১ মার্চ পাঁচ বছর মেয়াদি ‘এলডিডিপি’ প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলেও প্রকল্পটির কাজে ব্যবহৃত গাড়ি এখনো ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। মেয়াদোত্তীর্ণ প্রকল্পের গাড়ি ব্যবহারের কারণ জানতে চাইলে ডা. শওকত আলী বলেন, “গাড়িটি গ্যারেজে ফেলে রাখলে নষ্ট হয়ে যাবে, তাই মাঝে মাঝে চালানো হয়।”

খামারিদের দাবি, মাঠকর্মীরা খামারিদের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও উন্নত প্রযুক্তি হস্তান্তরের মূল দায়িত্ব বাদ দিয়ে অবৈধভাবে চিকিৎসাসেবায় জড়ালে সরকারের প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন কার্যক্রম মুখ থুবড়ে পড়বে।

সার্বিক অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে ফরিদপুর জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. এ কে এম আসজাদের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।