ফরিদপুরে সিজারের পর পেটে গজ রেখে সেলাই: ৬ মাস যন্ত্রণার পর মারা গেলেন নার্স বিথী

অনলাইন ডেস্কঃ
৮ অক্টোবর, ২০২৬ ১:৫৬ পিএম
শেয়ার করুন:
ফরিদপুরে সিজারের পর পেটে গজ রেখে সেলাই: ৬ মাস যন্ত্রণার পর মারা গেলেন নার্স বিথী

ফরিদপুরে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের সময় পেটে গজ রেখে সেলাই করে দেওয়ার ঘটনায় দীর্ঘ ছয় মাস মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে অবশেষে না-ফেরার দেশে চলে গেলেন ডিপ্লোমা মিডওয়াইফ (নার্স) বিথী আক্তার (২৫)। চিকিৎসকদের চরম অবহেলা ও ভুল চিকিৎসার কারণে এক নবজাতক মা হারাল তার গর্ভধারিণীকে। 

বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (ঢামেক) চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। নিহত বিথী আক্তার রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার উজানচর ইউনিয়নের তমিজ উদ্দিন মৃধার পাড়া এলাকার বাসিন্দা এবং পেশায় একজন ডিপ্লোমা মিডওয়াইফ ছিলেন। বিথীর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন তাঁর স্বামী রাকিবুল ইসলাম।

ঘটনার সূত্রপাত ও পরিবারের অভিযোগ:  
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, গত ৬ মে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সন্তান প্রসবের জন্য বিথীর সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার করা হয়। অস্ত্রোপচারটি পরিচালনা করেন ডা. তামান্না এবং ইন্টার্ন চিকিৎসক অরবিন্দ। অভিযোগ রয়েছে, অস্ত্রোপচার চলাকালে চিকিৎসকদের অসাবধানতায় বিথীর পেটের ভেতরে গজ রেখেই সেলাই সম্পন্ন করা হয়।

অস্ত্রোপচারের কিছুদিন পর থেকেই বিথী পেটে তীব্র ব্যথা ও নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগতে শুরু করেন। অবস্থার অবনতি হলে প্রথম অস্ত্রোপচারের প্রায় দুই মাস পর বিষয়টি ধরা পড়ে এবং তাঁকে পুনরায় বড় ধরনের একটি অস্ত্রোপচারের মুখোমুখি হতে হয়। দীর্ঘদিন পেটে গজ থাকায় তাঁর নাড়িতে মারাত্মক পচন ও সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তী সময়ে তাঁকে বাইপাস সার্জারিসহ একাধিক জটিল প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয় এবং লাইফ সাপোর্টে (আইসিইউ/সিসিইউ) রাখা হয়।

সন্তানকে দুধ খাওয়ানোর সুযোগটুকুও পাননি মা:  
বিথীর স্বামী রাকিবুল ইসলাম অশ্রুসজল কণ্ঠে জানান, দীর্ঘ ছয় মাসের দুঃসহ যন্ত্রণায় তাঁর স্ত্রীর শরীর কঙ্কালসার হয়ে গিয়েছিল। একসময় ৬১ কেজি ওজনের বিথীর ওজন কমে দাঁড়িয়েছিল মাত্র ৩৮ কেজিতে। অসুস্থতার ভয়াবহতায় নিজের সদ্যোজাত সন্তানকে একবারের জন্যও কোলে তুলে দুধ খাওয়ানোর শক্তি বা সুযোগ তিনি পাননি। চিকিৎসকদের অবহেলার কারণেই অকালে একটি তরতাজা প্রাণ ঝরে গেল বলে অভিযোগ করেন তিনি।

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও পরবর্তী পদক্ষেপ: 
ভুল চিকিৎসার অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে অভিযুক্ত ডা. তামান্নার ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে এ বিষয়ে চিকিৎসকদের কোনো তাৎক্ষণিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

ঘটনাটির বিষয়ে গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাইফুল হুদা গভীর শোক প্রকাশ করে জানান, "বিষয়টি অত্যন্ত মর্মান্তিক ও বেদনাদায়ক। এরই মধ্যে জেলা প্রশাসক মহোদয় ও আমি নিজে গিয়ে বিথীর মাতৃহীন শিশুসন্তানটিকে দেখে এসেছি। পুরো ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া প্রয়োজন এবং চিকিৎসায় অবহেলার প্রমাণ মিললে দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।"

এদিকে, একজন স্বাস্থ্যকর্মীর এমন মর্মান্তিক মৃত্যুতে পরিবার ও স্থানীয়দের মধ্যে গভীর শোকের পাশাপাশি তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। স্বজনরা দ্রুত এই ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্ত ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।