এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।
বলিউডের প্রায় পাঁচ দশকের অভিনয়জীবনে নিজের শক্তিশালী উপস্থিতি জানান দিয়েছিলেন বরেণ্য অভিনেতা নানা পাটেকর। তবে কেবল রূপালি পর্দার দুর্দান্ত অভিনয়েই নয়, তিনি মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন তাঁর স্পষ্টভাষী ব্যক্তিত্ব, চরম সাদাসিধে জীবনযাপন এবং সাধারণ মানুষের প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসার কারণে।বিপুল খ্যাতি আর অর্থ উপার্জনের অবারিত সুযোগ থাকা সত্ত্বেও বিলাসবহুল জীবনের মোহ কখনোই তাঁকে টানেনি।
বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানা যায়, নিজের উপার্জনের সিংহভাগই নানা পাটেকর ব্যয় করতেন আর্তপীড়িতদের সেবায়। এমনকি তাঁর মোট আয়ের প্রায় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত তিনি অসহায় মানুষ ও কৃষকদের কল্যাণে দান করতেন।
কৃষকদের ত্রাতা ও ‘নাম ফাউন্ডেশন’
মহারাষ্ট্রের খরাপ্রবণ অঞ্চলের কৃষকদের দুর্দশা নানা পাটেকরকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। কৃষকদের পাশে দাঁড়াতে ২০১৫ সালে সহ-অভিনেতা মকরন্দ অনাসপুরের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে তিনি গড়ে তোলেন ‘নাম ফাউন্ডেশন’। সংস্থাটি কৃষকদের প্রত্যক্ষ আর্থিক সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি খরা মোকাবিলায় পানি সংরক্ষণ ও গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখে। ঋণগ্রস্ত হয়ে আত্মহত্যা করা বহু কৃষক পরিবারের পাশে ব্যক্তিগতভাবে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। এছাড়া ‘পাঠশালা’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য প্রাপ্ত পুরো পারিশ্রমিকই তিনি পাঁচটি দাতব্য সংস্থাকে দান করে দিয়েছিলেন।
তারকাখ্যাতির ভিড়ে আড়ম্বরহীন জীবন
বলিউডের শীর্ষ তারকাদের যেখানে বিলাসবহুল প্রাসাদোপম বাড়ি থাকে, সেখানে নানা পাটেকর ক্যারিয়ারের শীর্ষে থেকেও দীর্ঘদিন বসবাস করেছেন মুম্বাইয়ের আন্ধেরির মাত্র ৭৫০ বর্গফুটের এক বেডরুমের সাধারণ ফ্ল্যাটে। কয়েক দশক আগে মাত্র ১ লাখ ১০ হাজার রুপিতে কেনা সেই ফ্ল্যাটেই স্বাচ্ছন্দ্য খুঁজে পেতেন তিনি।
গাড়ির ক্ষেত্রেও তাঁর কোনো বাড়তি বিলাসিতা ছিল না। একবার প্রায় দেড় কোটি রুপি মূল্যের একটি বিলাসবহুল গাড়ি কেনার সুযোগ তৈরি হলেও তিনি তা না নিয়ে সেই অর্থ দুস্থ কৃষক পরিবারের সহায়তায় দান করার সিদ্ধান্ত নেন।
মাটির কাছাকাছি: পুনের ফার্মহাউসে চাষাবাদ
প্রকৃতি ও মাটির সঙ্গে নানা পাটেকরের নাড়ির টান ছিল গভীর। পুনের খাডাকওয়াসলায় প্রায় ২৭ একরের একটি ফার্মহাউস ছিল তাঁর। সেখানে শুধু অবকাশযাপন নয়, তিনি নিজে উপস্থিত থেকে ধান, গম, পেঁয়াজ ও রসুনের চাষ করতেন। ওই ফার্মহাউস থেকে উৎপাদিত ফসলের বিক্রয়লব্ধ অর্থও ব্যয় হতো স্থানীয় কৃষক ও দরিদ্র শ্রমিকদের কল্যাণে। জীবনের শেষভাগে তিনি মুম্বাই, পুনে ও গোয়ার ডোনা পাউলার বাড়ির মধ্যে সময় ভাগ করে কাটাতেন।
আপসহীন ব্যক্তিত্ব ও বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ার
স্পষ্ট মতামত প্রকাশ ও কাজের ক্ষেত্রে কখনোই কোনো আপস না করায় নানা পাটেকর ক্যারিয়ারে একাধিকবার বিতর্কেও জড়িয়েছেন। প্রযোজক-পরিচালকদের সঙ্গে মতবিরোধে কিছু কাজ হাতছাড়া হলেও নিজের নীতি থেকে তিনি কখনো বিচ্যুত হননি।
অভিনয়জীবনে তিনি তিনবার ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, একাধিক ফিল্মফেয়ার পুরস্কার এবং ভারতের অন্যতম সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘পদ্মশ্রী’ অর্জন করেন।
জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত চলচ্চিত্রের চাকচিক্যের বাইরে থেকে মাটি ও মানুষের সঙ্গে একাত্ম হয়ে ছিলেন এই অভিনেতা। জীবনের ইতি টানলেও তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘নাম ফাউন্ডেশন’ এবং সাধারণ মানুষের জন্য রেখে যাওয়া অবদান চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে।