বোনের মমতায় কাটছে দুই দশক: মহম্মদপুরে অবুঝ শিশুর মতোই দিন কাটে ষাটোর্ধ্ব নিতাইয়ের

বিশ্বজিৎ সিংহ রায়, স্টাফ রিপোর্টার, মাগুরাঃ
৭ অক্টোবর, ২০২৬ ২:১০ পিএম
শেয়ার করুন:
বোনের মমতায় কাটছে দুই দশক: মহম্মদপুরে অবুঝ শিশুর মতোই দিন কাটে ষাটোর্ধ্ব নিতাইয়ের

কারও চোখে তিনি বাক ও বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী এক বৃদ্ধ, কারও কাছে নিতান্তই এক অসহায় মানুষ। বয়স ষাটের কোঠায় পৌঁছালেও তিনি যেন আজও এক অবুঝ শিশু। নিজের প্রয়োজনের কথা মুখ ফুটে বলতে পারেন না, ক্ষুধা পেলেও চেয়ে খাওয়ার সামর্থ্য নেই—জীবনের সবকিছুই তার নির্ভর করে অন্যের মমতা আর সহযোগিতার ওপর। এমন নিঃশব্দ জীবনের গল্প নিয়ে বেঁচে আছেন মাগুরার মহম্মদপুরের নিতাই সিকদার।

মাগুরা সদর উপজেলার হাজরাপুর ইউনিয়নের লাওতাড়া গ্রামের মৃত হরিপদ শিকদারের ছেলে নিতাই। বাবা-মাকে হারিয়েছেন প্রায় দুই দশক আগে। এরপর থেকেই বোনের ভালোবাসাই হয়ে উঠেছে তার একমাত্র ঠিকানা। গত ২০ বছর ধরে তিনি মহম্মদপুর উপজেলার রাজাপুর ইউনিয়নের রাজপাট গ্রামে বোন শিতু রানী প্রামাণিক ও ভগ্নিপতি শ্রীবাস কুমার প্রামাণিকের সংসারে পরম মমতায় আশ্রয় পেয়ে আসছেন।

শারীরিক ও বুদ্ধিগত সীমাবদ্ধতার কারণে স্বাভাবিক মানুষের মতো কথা বলতে পারেন না নিতাই। নিজের ভালো-মন্দ বোঝার মতো অনুভূতিও তার সীমিত। প্রায়ই তাকে দেখা যায় গ্রামীণ সড়কের পাশে, গাছের নিচে কিংবা বাগানের এক কোণে আনমনে বসে থাকতে। খাবারের বিষয়টিও তার জীবনে একেবারেই ভিন্ন—সামনে খাবার তুলে দিলে খেয়ে নেন, কিন্তু কেউ না দিলে কিংবা মনে করিয়ে না দিলে দীর্ঘ সময় না খেয়েই চুপচাপ বসে থাকেন। কখন ঘুমাতে হবে, কোথায় বিশ্রাম নিতে হবে—সেটিও যেন তাকে হাত ধরে শিখিয়ে দিতে হয়।

বোন শিতু রানী ও ভগ্নিপতি শ্রীবাস প্রামাণিক জানান, মা-বাবার মৃত্যুর পর নিতাইয়ের দায়িত্ব নেওয়ার মতো আর কেউ ছিল না। নিজেদের সংসারে অভাব-অনটন থাকলেও রক্ত আর মানবতার টানে নিতাইকে তারা কখনো বোঝা মনে করেননি। দীর্ঘ ২০ বছর ধরে নিজেদের সামর্থ্যের মধ্যে তার অন্ন, বস্ত্র ও আশ্রয়ের দায়িত্ব পালন করে আসছেন তারা। 

পরিবারের সদস্যরা আরও জানান, কোনো আত্মীয়ের বাড়ি বা সামাজিক নিমন্ত্রণে গেলেও নিতাইকে একা ফেলে রাখা সম্ভব হয় না। সঙ্গে করে নিয়ে গিয়ে তাকে খাইয়ে দিতে হয়। অবুঝ এই মানুষটির সার্বক্ষণিক খেয়াল রাখতেই পরিবারের সদস্যদের অতিরিক্ত নজরদারি বজায় রাখতে হয়।

নিতাই সিকদারের এই জীবনযাপন কেবল কোনো বঞ্চনার গল্প নয়; এটি পারিবারিক দায়িত্ববোধ ও নিঃস্বার্থ মমতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। যে বয়সে মানুষের অনেক হিসাব-নিকাশ ও প্রত্যাশা থাকে, সে বয়সে নিতাইয়ের পৃথিবীটা একেবারেই সাদামাটা। কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই তার; একমুঠো অন্ন, একটি নিরাপদ বিছানা আর আপনজনের স্নেহের পরশটুকুই তার কাছে সবচেয়ে বড় শান্তি। আর সেই পৃথিবীতে বোন ও ভগ্নিপতির আন্তরিক ভালোবাসাই আজ ষাটোর্ধ্ব নিতাইয়ের বেঁচে থাকার সবচেয়ে বড় আশ্রয়।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।