দাওয়াত না পাওয়ায় ক্ষোভ: সদরপুরে ৩০ শিক্ষার্থীর ‘স্কুল বর্জন’, ব্যাহত পাঠদান

নুরুল ইসলাম, স্টাফ রিপোর্টারঃ
৫ অক্টোবর, ২০২৬ ১:০৯ পিএম
শেয়ার করুন:
দাওয়াত না পাওয়ায় ক্ষোভ: সদরপুরে ৩০ শিক্ষার্থীর ‘স্কুল বর্জন’, ব্যাহত পাঠদান

ফরিদপুরের সদরপুরে বিদ্যালয়ের নতুন ভবন উদ্বোধনে দাওয়াত না পাওয়াকে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিতে বড় ধরনের ধস নেমেছে। স্থানীয় এক প্রভাবশালী ব্যক্তির নির্দেশে অভিভাবকদের একাংশ সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠানো বন্ধ রেখেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। গত চার দিন ধরে বিদ্যালয়টির প্রায় ৩০ জন শিক্ষার্থী ক্লাসে অনুপস্থিত থাকায় স্বাভাবিক পাঠদান কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। 

ঘটনাটি ঘটেছে উপজেলার ভাষাণচর ইউনিয়নের চর চাঁদপুর কোলচুরী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে।

আকস্মিক উদ্বোধনেই বাধে বিপত্তি
বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৮৭ সালে প্রতিষ্ঠিত চর চাঁদপুর কোলচুরী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বর্তমানে ১০৭ জন শিক্ষার্থী এবং চারজন শিক্ষক রয়েছেন। গত ২৭ সেপ্টেম্বর বিদ্যালয়টির নতুন ভবন নির্মাণকাজের উদ্বোধন করা হয়। 

বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দাবি, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হঠাৎ করে উদ্বোধনের তারিখ ও সময় চূড়ান্ত করায় স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের আলাদাভাবে আমন্ত্রণ জানানোর মতো পর্যাপ্ত সময় পাওয়া যায়নি। 

বৈঠক করে ‘স্কুল বর্জনের’ ডাক  
অভিযোগ রয়েছে, উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দাওয়াত না পেয়ে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত কামরুল হাসান ক্ষুব্ধ হন। পরদিন ২৮ সেপ্টেম্বর রাতে তিনি বাড়ির পাশের একটি চায়ের দোকানে স্থানীয় অভিভাবকদের নিয়ে বৈঠক করেন। সেখানে সন্তানদের ওই বিদ্যালয় থেকে ছাড়পত্র (টিসি) নিয়ে অন্য বিদ্যালয়ে ভর্তি করার পরামর্শ দেন তিনি। ওই বৈঠকের পর থেকেই অভিভাবকেরা সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠানো বন্ধ করে দেন।

বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ আলী খান বলেন, “হঠাৎ করে উদ্বোধনের বিষয়টি কামরুল হাসানকে বুঝিয়ে বলা হলেও তিনি তা মানতে চাননি। উল্টো অভিভাবকদের সঙ্গে বৈঠক করে বাচ্চাদের বিদ্যালয় থেকে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত দেন।”

উপস্থিতিতে ধস, অন্য বিদ্যালয়ে গিয়েও ফিরল শিক্ষার্থীরা 
সহকারী শিক্ষক আব্দুল আজিজ জানান, বিদ্যালয়টিতে স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন গড়ে ৬৫ থেকে ৭০ জন শিক্ষার্থী উপস্থিত থাকত। তবে গত চার দিন ধরে তা কমে মাত্র ২৫-৩০ জনে নেমে এসেছে। এরই মধ্যে পাঁচ-ছয়জন শিক্ষার্থী ছাড়পত্র (টিসি) নিয়ে চলে গেছে।

এদিকে কোলচুরী বিদ্যালয় থেকে প্রায় ২৫-২৭ জন শিক্ষার্থী পাশের চর চাঁদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে। ওই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ভগিরত সাহা বলেন, “ছাড়পত্র ছাড়া এত শিক্ষার্থীকে অন্য বিদ্যালয় থেকে এসে একযোগে ভর্তির সুযোগ নেই। তাই তাদের ভর্তি নেওয়া সম্ভব হয়নি।”

সন্তানদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে পড়ায় স্থানীয় অভিভাবকদের একাংশের মধ্যেও এখন উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে।

অভিযোগ অস্বীকার কামরুল হাসানের  
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে কামরুল হাসান প্রভাব বিস্তারের কথা অস্বীকার করে বলেন, “সরকারি চাকরির সুবাদে আমি ফরিদপুর শহরে থাকি। এলাকায় মাতবরি করার প্রশ্নই ওঠে না। বিদ্যালয়ে হয়তো ঠিকমতো পড়াশোনা হয় না, তাই অভিভাবকেরা নিজ উদ্যোগে সন্তানদের অন্যত্র ভর্তি করাতে চাইছেন। কেউ শত্রুতা করে আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে।”

তবে ভাষাণচর ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মো. ফরিদ হোসেন জানান, কামরুল হাসান এলাকায় প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। অন্যদিকে ভাষাণচর ইউপি চেয়ারম্যান মো. গোলাম কাওসার বলেন, শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে যাচ্ছে না—এমন তথ্য তিনিও জেনেছেন এবং বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখছেন।

প্রশাসনের আশ্বাস 
সদরপুর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মামুনুর রহমান বলেন, “প্রধান শিক্ষকের মাধ্যমে বিষয়টি আমরা অবগত হয়েছি। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পাঠদান ব্যাহত হওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, ব্যক্তিবিশেষের মান-অভিমানের বলি যেন শিক্ষার্থীরা না হয়। দ্রুত প্রশাসনিক হস্তক্ষেপে বিদ্যালয়ে স্বাভাবিক ও শিক্ষার অনুকূল পরিবেশ ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।