এক শমসেরই হাতিয়েছেন সরকারের ১৯৪টি প্লট

অনলাইন ডেস্কঃ
৮ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:২৫ পিএম
শেয়ার করুন:
এক শমসেরই হাতিয়েছেন সরকারের ১৯৪টি প্লট

সরকারি নথিপত্রে যার কোনো বরাদ্দ বা ইজারার অস্তিত্ব নেই, রাজধানীর বুকে সেই চার একর সরকারি জমিতেই এখন গড়ে উঠেছে ব্যক্তিমালিকানাধীন বহুতল ভবন, মার্কেট ও ঘনবসতি। জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের কোনো কর্মচারী না হয়েও নিজেকে ‘কর্মকর্তা’ পরিচয় দিয়ে বছরের পর বছর ধরে এমন অবিশ্বাস্য জালিয়াতি চালিয়ে গেছেন শমসের আলী নামের এক ব্যক্তি। সরকারি প্রতিষ্ঠানের কিছু অসাধু কর্মচারীর যোগসাজশে নিম্নবিত্তদের জন্য সংরক্ষিত ১৯৪টি আবাসিক প্লট বিক্রি করে তিনি হাতিয়ে নিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। 

রাজধানীর মিরপুর-১ নম্বর সেকশনের ‘এইচ’ ব্লকের বিশিল মৌজায় অবস্থিত এই এলাকাটি বর্তমানে ‘শাহ আলী নগর’ বা ‘শমসের নগর’ নামে পরিচিত। বেদখল হওয়া এই ৪ দশমিক ২৬৬৬ একর জমির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৪০০ থেকে ৬৫০ কোটি টাকা (সরকারি হিসেবে ২১৫ থেকে ৩০০ কোটি টাকা)।

যেভাবে চলত জালিয়াতির সিন্ডিকেট
নথিপত্র পর্যালোচনা ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা গেছে, মিরপুর গৃহায়ন অফিসে নিয়মিত যাতায়াত করতেন স্থানীয় বাসিন্দা শমসের আলী। একপর্যায়ে তিনি নিয়মিত সেখানে বসতে শুরু করেন এবং কর্মকর্তাদের অগোচরে সরকারি নথি নাড়াচাড়া ও নিজের কাছে রাখা শুরু করেন। এরপর নিজেকে গৃহায়নের কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলেন।

পরবর্তীতে গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের সাবেক কর্মচারী নুরুজ্জামানসহ একটি অসাধু চক্রের সহায়তায় ওই জমির নকল কাগজপত্র তৈরি করেন শমসের। প্রভাবশালীদের ম্যানেজ করতে নামমাত্র মূল্যে তাদের নামে প্লট লিখে দেওয়া হয়। বাকি জমি ‘শাহআলী নগর হাউজিং এস্টেট’-এর নামে চড়া মূল্যে সাধারণ মানুষের কাছে বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়।

ডুইপ প্রকল্পের জমি ও নথির গরমিল
তৎকালীন গৃহসংস্থান অধিদপ্তরের অধীনে ১৯৯৮ সালের ১৩ ডিসেম্বর বাংলাদেশ গেজেটে বিশিল মৌজার ২০২ দশমিক ৪৩ একর জমি হুকুমদখল ও অধিগ্রহণ করা হয়। এর মধ্যে ঢাকা শহর অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের (ডুইপ) আওতায় নিম্নবিত্তদের জন্য ৪০ বর্গমিটার আয়তনের ১৯৪টি আবাসিক প্লট তৈরির মাস্টারপ্ল্যান ছিল। 

অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০০০ সালের ২০ এপ্রিল শমসের আলীর নামে ‘সহকারী কমিশনার সেটেলমেন্ট’-এর বরাতে একটি ভুয়া ইজারা দলিল (নম্বর ২১১৭) তৈরি করা হয়। তবে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের প্রধান কার্যালয়ের রেকর্ডরুমে এই জমি কাউকে ইজারা বা বরাদ্দ দেওয়ার কোনো বৈধ নথির অস্তিত্ব মেলেনি। সংরক্ষিত রেজিস্টারেও প্লট হস্তান্তরের কোনো তথ্য নেই।

জমিতে বহুতল ভবন, চলছে ব্যবসাও
সরেজমিনে দেখা গেছে, ডুইপ প্রকল্পের সংরক্ষিত জমিতে কোনো সরকারি নিয়ন্ত্রণ নেই। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) অনুমোদন ছাড়াই সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে একতলা থেকে শুরু করে বহুতল ভবন, মার্কেট, দোকানপাট, এমনকি রিকশার গ্যারেজ ও কারখানা। সেখানে মিলছে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির বৈধ সংযোগও। সমিতির নামে বড় বড় সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে জমিগুলো ভোগদখল করা হচ্ছে। 

শমসেরের মৃত্যু, পরিবারের দাবি ও আইনি জটিলতা
অভিযুক্ত শমসের আলী বর্তমানে প্রয়াত। তার মৃত্যুর পর বিষয়গুলো দেখভাল করতেন তার মেয়ে শমসের আরা সাথী। এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, *"বাবা জীবিত থাকতেই জমিগুলো বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে বিক্রি করে গেছেন। আমাদের পরিবারের নামে কোনো জমি নেই। বাবা কোনো কাগজপত্রও আমাদের বুঝিয়ে দিয়ে যাননি।"*

এদিকে, সরকারি অধিগ্রহণকৃত জমি প্লট বানিয়ে বিক্রির অভিযোগে ২০১৬ সালের ২ ফেব্রুয়ারি দারুস সালাম থানায় শমসের আলীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একটি মামলা দায়ের হয়, যা এখনও চলমান। 

অন্যদিকে, জমির বৈধতা দাবি করে শাহআলী নগর হাউজিং এস্টেটের পক্ষে আব্দুল মতিন নামের এক ব্যক্তি ৬১ জন প্লটগ্রহীতাকে নিয়ে গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে দেওয়ানি মামলা করেছেন। দখল টিকিয়ে রাখতে উচ্চ আদালতে রিট পিটিশনও দায়ের করা হয়েছে। গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ বলছে, এই মামলার পেছনেও জালিয়াতির আশ্রয়ে তৈরি করা ভুয়া দলিল ব্যবহার করা হয়েছে।

কঠোর ব্যবস্থার আশ্বাস কর্তৃপক্ষের
ইতিমধ্যেই অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ ও অভিযান পরিচালনার জন্য গৃহায়নের প্রধান কার্যালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ফেরদৌসী বেগম জানান, "গৃহায়নের গেজেটভুক্ত জমি কেউ অবৈধভাবে দখল করে থাকলে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নিম্নবিত্তদের জন্য নির্ধারিত এই ১৯৪টি প্লট ও সরকারি সম্পত্তি উদ্ধার করতে আইন অনুযায়ী যা যা করণীয়, সরকার তার সবই করবে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।