৫০ বছর পর পাকিস্তান থেকে শেকড়ে ফিরলেন নগরকান্দার পরী বেগম: ভাষা ভুলে গেলেও ভোলেননি নাড়ির টান

শফিকুল ইসলাম জনি, ফরিদপুর প্রতিনিধিঃ
১৩ অক্টোবর, ২০২৬ ২:১৯ পিএম
শেয়ার করুন:
৫০ বছর পর পাকিস্তান থেকে শেকড়ে ফিরলেন নগরকান্দার পরী বেগম: ভাষা ভুলে গেলেও ভোলেননি নাড়ির টান

মাত্র ১০ বছর বয়সে কোলছাড়া হয়েছিলেন পরিবারের। এরপর মানব পাচারকারী চক্রের খপ্পরে পড়ে ভারত হয়ে চলে যান পাকিস্তানে। কেটে গেছে জীবনের দীর্ঘ অর্ধশতক। সেখানে সংসার পেতেছেন, সন্তানের জননী হয়েছেন; তবুও স্মৃতির মণিকোঠায় অমলিন ছিল জন্মভূমি ও ফেলে আসা স্বজনদের মুখ। অবশেষে ৬০ বছর বয়সে পাকিস্তান থেকে জন্মভূমি বাংলাদেশে ফিরে ভাইদের বুকে জড়িয়ে ধরেছেন পরী বেগম। 

দীর্ঘ পাঁচ দশক ভিনদেশে থাকায় হারিয়ে গেছে মাতৃভাষা বাংলায় কথা বলার অভ্যাস। নিজের ভাইদের সামনে বসে মনের ভাব প্রকাশ করছেন উর্দুতে। তবে এই ভাষাগত ব্যবধান কোনো বাধা হতে পারেনি ভাই-বোনের আবেগঘন পুনর্মিলনে। দীর্ঘ বিচ্ছেদের অবসান ঘটিয়ে একে অপরকে ফিরে পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন পরিবারের সদস্যরা।

পরী বেগমের পৈতৃক নিবাস ফরিদপুরের নগরকান্দা পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডে। তাঁর বাবার নাম মরহুম মমিন মাতুব্বর। স্বজনদের ভাষ্যমতে, প্রায় ৫০ বছর আগে মাত্র ১০ বছর বয়সে নিখোঁজ হন তিনি। পাচারকারীদের মাধ্যমে প্রথমে ভারত এবং পরে পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয় তাঁকে। সেখানে কয়েক দফা হাতবদলের পর ভাগ্যক্রমে এক নিঃসন্তান পাকিস্তানি দম্পতির আশ্রয়ে যান তিনি। তাঁরাই পরী বেগমকে পরম স্নেহে নিজেদের সন্তানের মতো লালন-পালন করেন। পরবর্তীতে এক পাকিস্তানি নাগরিকের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। তাঁদের সংসারে রয়েছে এক ছেলে ও এক মেয়ে। 

সংসারের ব্যস্ততায় জীবনের দীর্ঘ সময় পার হলেও জন্মভূমি কিংবা ভাইদের স্মৃতি কখনো মুছে যায়নি পরী বেগমের মন থেকে। তবে দেশান্তরী হয়ে যাওয়া বোনকে আবার ফিরে পাওয়ার আশা পরিবার প্রায় ছেড়েই দিয়েছিল।

যেভাবে মিলল স্বজনদের খোঁজ 
পরী বেগমের হারিয়ে যাওয়া পরিবারের সন্ধান পাওয়ার গল্পটি সিনেমার চিত্রনাট্যকেও হার মানায়। আর এই পুনর্মিলনের সেতুবন্ধ তৈরি করেন পাকিস্তানে অধ্যয়নরত দুই বাংলাদেশি তরুণ।

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, রাজশাহীর বাসিন্দা ওই দুই শিক্ষার্থী পাকিস্তানের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছেন। সেখানে ঘটনাক্রমে পরী বেগমের নাতির সঙ্গে পরিচয় হয় তাঁদের। আলাপের একপর্যায়ে নাতি জানান তাঁর দাদির বাংলাদেশে হারিয়ে যাওয়া পরিবারের গল্প। বিষয়টি জেনে কৌতূহলী দুই শিক্ষার্থী পরী বেগমের সঙ্গে সরাসরি দেখা করেন। 

তখন পরী বেগম স্মৃতি হাতড়ে জানান, তাঁর বাড়ি বাংলাদেশের ফরিদপুরের নগরকান্দায়। বাবার নাম মমিন মাতুব্বর এবং ভাইদের নাম নওশের আলী, সাইফুল ও সোলেমান মাতুব্বর। 

এই তথ্যগুলোর সূত্র ধরে দেশে ফিরে ওই দুই যুবক নগরকান্দায় খোঁজখবর শুরু করেন এবং সফলভাবে পরী বেগমের ভাইদের সন্ধান পেয়ে যান। এরপর মোবাইল ফোনে ভিডিও কলে দীর্ঘ ৫০ বছর পর হারিয়ে যাওয়া ভাই-বোনের প্রথম যোগাযোগ হয়। নিশ্চিত হওয়া যায় রক্তের পরিচয়। এরপরই পাকিস্তানি পাসপোর্ট নিয়ে স্বজনদের কাছে ছুটে আসেন পরী বেগম।

ভাষা বদলেছে, বদলায়নি ভালোবাসা  
অর্ধশতাব্দী পর ছোটবেলার সেই বোনকে কাছে পেয়ে আনন্দের জোয়ারে ভাসছেন ভাইয়েরা। বয়সের ভারে সবার চেহারায় পরিবর্তনের ছাপ পড়লেও রক্তের টান রয়ে গেছে আগের মতোই।

সবচেয়ে আবেগঘন বিষয় হলো, পরী বেগম এখন আর বাংলায় কথা বলতে পারছেন না। পাকিস্তানি সংস্কৃতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে গিয়ে তাঁর প্রাত্যহিক ভাষা হয়ে দাঁড়িয়েছে উর্দু। ভাইদের সামনে বসেও তিনি মনের কথাগুলো বলছেন উর্দুতেই। ভাইয়েরা হয়তো সব শব্দের অর্থ পুরোপুরি বুঝতে পারছেন না, কিন্তু বোনের চোখের ভাষা ও ভেতরের আকুলতা বুঝতে কোনো ভাষার প্রয়োজন হচ্ছে না তাঁদের। 

পৈতৃক ভিটায় উৎসবের আমেজ 
দীর্ঘ ৫০ বছর পর পরী বেগমের ফিরে আসার খবরে পুরো নগরকান্দা এলাকায় আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। মমিন মাতুব্বরের পৈতৃক বাড়িতে এখন উৎসবের আমেজ। দূর-দূরান্ত থেকে আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীরা ভিড় জমাচ্ছেন পাকিস্তানফেরত এই বোনকে একনজর দেখতে। অনেকে শুনছেন তাঁর জীবনের রোমাঞ্চকর ও বেদনাভরা গল্প। 

বোনকে ফিরে পাওয়ার আনন্দে পরিবারের পক্ষ থেকে স্থানীয় মসজিদে বিশেষ দোয়া ও শুকরিয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। 

যে বালিকাটি একদিন অসহায় অবস্থায় শেকড়চ্যুত হয়ে পাড়ি জমিয়েছিল এক অচেনা দেশে, জীবনের গোধূলিবেলায় এসে সে ফিরে পেয়েছে তাঁর হারানো নীড়। ভাষা, সংস্কৃতি ও ভৌগোলিক দূরত্ব অতিক্রম করে পরী বেগমের এই ঘরে ফেরা প্রমাণ করে—সময়ের ব্যবধান যত দীর্ঘই হোক, নাড়ির টান কখনো মুছে যায় না।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।