মাইলস্টোন ট্র্যাজেডি/‘জোরে শব্দ হলেই মনে হয় আবার বিমান পড়বে’

অনলাইন ডেস্কঃ
২২ জুলাই, ২০২৬ ১১:২৯ এএম
শেয়ার করুন:
মাইলস্টোন ট্র্যাজেডি/‘জোরে শব্দ হলেই মনে হয় আবার বিমান পড়বে’

ক্যালেন্ডারের পাতা ঘুরে পেরিয়ে গেছে একটি বছর। কিন্তু উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তের সেই ভয়াবহ স্মৃতি আজও তাড়া করে ফিরছে প্রত্যক্ষদর্শী, আহত শিক্ষার্থী এবং নিহতদের স্বজনদের। শরীরে পোড়া ক্ষত আর দফায় দফায় অস্ত্রোপচারের যন্ত্রণার চেয়েও তাদের বেশি পোড়াচ্ছে স্বজন হারানোর বেদনা। সেই সাথে মানসিকভাবে থমকে যাওয়া শিশুদের তাড়া করছে তীব্র ভয়, আতঙ্ক আর দুঃস্বপ্ন।

‘বিকট শব্দ হলেই মনে হয় আবার বিমান পড়বে’

দুর্ঘটনায় আহত সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী নাফা আহমেদ পায়েল এখন শারীরিক সুস্থতার লড়াইয়ে ব্যস্ত। তবে শরীর কিছুটা সারলেও তার মনের ক্ষত আজও তাজা। সেদিনের স্মৃতি হাতড়ে পায়েল বলে, "এখনও কোথাও বিকট কোনো শব্দ শুনলেই মনে হয়—এই বুঝি আবার বিমান ভেঙে পড়ল।"

ভয়াবহ সেই দিনের বর্ণনা দিতে গিয়ে সে জানায়, হঠাৎ বিকট এক শব্দ হলো, আর চোখের পলকে চারদিক কালো ধোঁয়ায় ঢেকে গেল। চারদিকে তখন শুধু মানুষের আর্তনাদ আর বাঁচার আকুতি। শ্রেণিকক্ষে আটকে পড়ে সে তখন সাহায্যের জন্য ও একটু পানির জন্য চিৎকার করছিল। নিজের হাত পুড়তে দেখে মনে হয়েছিল জীবন বুঝি ওখানেই শেষ।

আজও পায়েলের শরীরে আগুনের ক্ষতচিহ্নগুলো জ্বলজ্বল করছে। রোদে গেলে ফোসকা পড়ে, গরমে বাড়ে অস্বস্তিকর চুলকানি। রাতে দুঃস্বপ্নের ঘোরে বারবার ঘুম ভেঙে যায় তার।

জীবন বদলে দেওয়া এক ‘অভিশপ্ত দিন’

একই দুর্ঘটনার শিকার আরেক শিক্ষার্থী জায়ানা মাহাবুব। ঘটনার সময় সে ছিল শিক্ষিকাদের কক্ষে (টিচার্স রুম)। মুহূর্তের মধ্যে বদলে যায় তার সাজানো জীবন। জায়ানা বলে, "২১ জুলাই অনেকের কাছে সাধারণ একটি দিন হতে পারে, কিন্তু আমাদের কাছে এটি আজীবন এক অভিশপ্ত দিন হয়ে থাকবে। আকাশে কোনো প্রশিক্ষণ বিমানের শব্দ শুনলেই এখনও বুক ধড়ফড় করে ওঠে।"

পোড়া ক্ষতের দীর্ঘমেয়াদি ও জটিল চিকিৎসার কথা উল্লেখ করে জায়ানা আহতদের জন্য আজীবন স্বাস্থ্য কার্ড ও রাষ্ট্রীয়ভাবে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা সুরক্ষার নিশ্চয়তা দাবি করে।

মানসিক জটিলতা ও পাহাড়সম চিকিৎসা ব্যয়

আহত শিক্ষার্থী তাসমিয়া খন্দকারের মা শাহেরা খান মেয়ের বর্তমান শারীরিক ও মানসিক অবস্থা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি জানান, মেয়ের দুই হাতের ক্ষত কিছুটা শুকালেও মানসিকভাবে সে দিন দিন আরও দুর্বল হয়ে পড়ছে। তাসমিয়া এখন পিটিএসডি (পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার) এবং ওসিডিতে ভুগছে। বিমানের শব্দ শুনলেই সে কানে হাত দিয়ে চিৎকার করে ওঠে। বাধ্য হয়ে তাকে আবারও হাসপাতালে ভর্তি করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারা।

চিকিৎসা ব্যয়ের কথা উল্লেখ করে শাহেরা খান বলেন, ইতোমধ্যে মেয়ের চিকিৎসায় পাঁচ লাখ টাকারও বেশি খরচ হয়েছে। সরকারি সহায়তার আশ্বাস দেওয়া হলেও খরচের সিংহভাগ পরিবারকেই বহন করতে হচ্ছে। তবে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট এবং মাইলস্টোন কর্তৃপক্ষ কিছুটা সহায়তা করেছে।

একইভাবে, ২৫ শতাংশ দগ্ধ হওয়া শিক্ষার্থী আহসানাফ ইসলাম নিলয়ের মা আইভি হোসেন নিজুম জানান, চলতি মাসেই তার ছেলের তিনটি অস্ত্রোপচার করার কথা রয়েছে। কানের পুনর্গঠন এবং হাতের অস্ত্রোপচার শেষ হতে আরও কয়েক মাস সময় লেগে যাবে। আহতদের চিকিৎসার ব্যয়ভার বহনে রাষ্ট্রীয়ভাবে আজীবন স্বাস্থ্য কার্ড এবং উপযুক্ত ক্ষতিপূরণের জোর দাবি জানান তিনি।

‘টাকা নয়, আমরা সুষ্ঠু বিচার চাই’

দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো শিক্ষার্থী ওয়াকিয়া ফেরদৌস নিধির বড় ভাই মোহাম্মদ এনামুল হাসান রায়হান বোনকে হারানোর তীব্র কষ্ট বুকে চেপে আছেন। তিনি বলেন, "একটি বছর পেরিয়ে গেলেও আমাদের প্রাপ্তি শুধু দীর্ঘ অপেক্ষা। সকালে বোনকে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে এলাম, আর দুপুরে পেলাম তার নিথর দেহ। অথচ এক বছরেও আমরা কোনো বিচার পেলাম না।"

তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ না হওয়া এবং ক্ষতিপূরণের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার কথা জানিয়ে রায়হান প্রশ্ন তোলেন, "আমরা টাকার জন্য লড়ছি না। আমাদের প্রশ্ন—কেন একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর যুদ্ধবিমান আছড়ে পড়ল? কার অবহেলায় এতগুলো তাজা প্রাণ অকালে ঝরে গেল? আমরা দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই।"

ভুক্তভোগী পরিবারের মূল দাবিগুলো:

১. দুর্ঘটনার সুষ্ঠু ও প্রকৃত তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা।
২. ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা।
৩. আহতদের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার নিশ্চয়তা ও আজীবন রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্য কার্ড প্রদান।
৪. উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ এবং নিহতদের রাষ্ট্রীয়ভাবে শহীদের স্বীকৃতি দান।

দুর্ঘটনার প্রেক্ষাপট:
উল্লেখ্য, গত বছরের (২০২৫ সালের) ২১ জুলাই উত্তরার দিয়াবাড়িতে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভবনে বিধ্বস্ত হয়। মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনায় কর্তব্যরত পাইলট, শিক্ষক এবং ২৮ জন কোমলমতি শিক্ষার্থীসহ মোট ৩৬ জন প্রাণ হারান এবং আহত হন দেড় শতাধিক মানুষ।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।