প্রেমের বিরহ ভুলতে হাতে বাঁশি, ২৫ বছর ধরে সুর বিলাচ্ছেন ‘বাঁশি বাবলু’

কবির হোসেন, আলফাডাঙ্গা প্রতিনিধি, ফরিদপুরঃ
১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১০:৫৩ পিএম
শেয়ার করুন:
প্রেমের বিরহ ভুলতে হাতে বাঁশি, ২৫ বছর ধরে সুর বিলাচ্ছেন ‘বাঁশি বাবলু’

প্রেমে ব্যর্থ হয়ে অনেকেই হতাশায় নিমজ্জিত হন, নিজেকে গুটিয়ে নেন চার দেয়ালের বন্দিদশায়। তবে ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গার হাদী বাবুল আক্তার বাবলু হেঁটেছেন এক ভিন্ন পথে। জীবনের না-পাওয়ার বেদনা আর অপূর্ণ প্রেমকে তিনি রূপান্তর করেছেন সুরের শক্তিতে; হাতে তুলে নিয়েছেন বাঁশি। এরপর কেটে গেছে আড়াই দশক—সেই বাঁশির মায়াবী সুরেই নিজের অতীত ভুলে মানুষকে আনন্দ বিলিয়ে চলেছেন তিনি।

বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) দুপুরে আলফাডাঙ্গা হাসপাতাল রোডের একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সামনে আচমকাই ছড়িয়ে পড়ে মিষ্টি সুরের মূর্ছনা। সাইকেল থামিয়ে চেনা গানের সুর তুলতে শুরু করেন বাবলু। মুহূর্তেই আশপাশের পথচারী ও স্থানীয়রা মুগ্ধ হয়ে তাঁর চারপাশে ভিড় জমান। কিছুক্ষণের জন্য হলেও পুরো পরিবেশ যেন সুরের এক শান্ত আশ্রয়ে রূপ নেয়।

আলফাডাঙ্গা উপজেলার বানা ইউনিয়নের রুদ্রবানা গ্রামের হাদী আতিউর রহমানের ছেলে বাবলু। এলাকায় তিনি এক ডাকে ‘বাঁশি বাবলু’ নামেই পরিচিত। শিক্ষাজীবনে তিনি এসএসসি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন। জীবিকার তাগিদে কৃষিকাজের পাশাপাশি দর্জির কাজ করেন। তবে তাঁর প্রতিভা কেবল সুরেই সীমাবদ্ধ নয়; তিনি ভালো ফুটবল খেলেন, আবার শখের ‘দাবুড়ে’ ঘোড়া নিয়ে অংশ নেন বিভিন্ন গ্রামীণ ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতাতেও।

তবে নানা পরিচয়ের ভিড়ে বাবলুর আসল সত্ত্বা একজন বংশীবাদক। প্রায় ২৫ বছর ধরে বাঁশিই তাঁর ধ্যান-জ্ঞান। বাড়ি থেকে বের হলেই কাঁধে বা সাইকেলের হ্যান্ডেলে বাঁশি থাকা চাই। পথে চলতে গিয়ে পরিচিত কিংবা অপরিচিত যে কারও সুর শোনার আবদার হাসিমুখে পূরণ করেন তিনি; তাও সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। মানুষের মুখে একচিলতে প্রশান্তির হাসি ফোটানোই যেন তাঁর একমাত্র পারিশ্রমিক।

নিজের এই সুরযাত্রা সম্পর্কে বাবলু বলেন, “ওস্তাদ মনা মিয়া, জিতেন ঘোষ ও ওস্তাদ কায়েমের সান্নিধ্যে বাঁশি বাজানো শিখেছি। কলেজজীবনে প্রেমে ব্যর্থ হওয়ার পর বাঁশির সুরের মাঝেই নিজের জীবনের আশ্রয় খুঁজে পেয়েছি। প্রায় ২৫ বছর ধরে বাঁশিই আমার সার্বক্ষণিক সঙ্গী। আমার বাঁশির সুরে সাধারণ মানুষ আনন্দ পেলেই আমার সার্থকতা। ভবিষ্যতে রেডিও, টেলিভিশন কিংবা চলচ্চিত্রে বাঁশি বাজানোর সুযোগ পাওয়াটাই এখন আমার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন।”

বাবলুর এই সুরের বন্দনা এখন স্থানীয়দের মুখে মুখে। স্থানীয় বাসিন্দা সিরাজুল ইসলাম ছিরু বলেন, “বাবলুর মাথায় লম্বা চুল আর বাঁশির মায়াবী সুর—দুটিই তাঁকে এক অনন্য পরিচিতি দিয়েছে। এ অঞ্চলে তাঁর বাঁশির সুর শোনেনি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার।”

আলফাডাঙ্গা সরকারি কলেজের প্রভাষক ও পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি প্রবীর কুমার বিশ্বাস বলেন, “বাঁশি আমাদের আবহমান বাংলার লোকজ সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাবলু দীর্ঘদিন ধরে গ্রাম-গঞ্জ, হাট-বাজার ও পথে পথে সুর ছড়িয়ে সেই প্রাচীন ঐতিহ্যকে সজীব রেখেছেন।”

অতীতের বিরহগাথা বাবলুকে থামিয়ে দেয়নি, বরং তাঁকে বানিয়ে দিয়েছে এক নিঃস্বার্থ সুরসাধক। সাইকেলে চড়ে পথে পথে সুর ছড়িয়ে চলা এই ‘বাঁশি বাবলু’ আজ আলফাডাঙ্গার এক পরিচিত ও ভালোবাসার নাম।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।