বিজেপি আসার পর পশ্চিমবঙ্গে গরুর মাংসের সংকট, বদলাচ্ছে মানুষের খাদ্যাভ্যাস

অনলাইন ডেস্কঃ
১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৫:১৮ পিএম
শেয়ার করুন:
বিজেপি আসার পর পশ্চিমবঙ্গে গরুর মাংসের সংকট, বদলাচ্ছে মানুষের খাদ্যাভ্যাস

পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও নতুন সরকারের কঠোর নীতিমালার জেরে রাজ্যজুড়ে গরুর মাংসের সরবরাহে তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। জোগান হ্রাস, অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এবং পশু জবাইয়ের ক্ষেত্রে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করায় কলকাতাসহ বিভিন্ন এলাকার অনেক রেস্তোরাঁ ও মাংসের দোকান ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম *আল জাজিরা*-র এক প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে এসেছে।

বন্ধ ট্যাংরা জবাইখানা, বাজারে সরবরাহ তলানিতে
কলকাতার ট্যাংরা এলাকায় অবস্থিত পুরসভার একমাত্র অনুমোদিত বড় গরু জবাইখানাটি মে মাস থেকে কার্যত বন্ধ রয়েছে। বিশাল ফটক ভেতর থেকে তালাবদ্ধ থাকায় পুরো চত্বর এখন খাঁ খাঁ করছে। 

জবাইখানার বিপরীতে অবস্থিত একটি ছোট রেস্তোরাঁর মালিক মোহাম্মদ মেহমুদ আলম জানান, মে মাসে এটি বন্ধ হওয়ার পর থেকে আশপাশের শ্রমিক ও নিম্ন আয়ের মানুষদের খাবারের জোগান কঠিন হয়ে পড়েছে। সরকার এটি দ্রুত চালু করবে কি না, তা নিয়ে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যে গভীর সংশয় তৈরি হয়েছে।

১৯৫০ সালের আইনের কড়া প্রয়োগ ও নতুন নির্দেশনা
গত মে মাসে বিধানসভা নির্বাচনে জয়লাভের পর ক্ষমতাসীন প্রশাসনের পক্ষ থেকে পশু জবাই সংক্রান্ত ১৯৫০ সালের ‘পশ্চিমবঙ্গ প্রাণী জবাই নিয়ন্ত্রণ আইন’ কঠোরভাবে বাস্তবায়নের নির্দেশনা দেওয়া হয়।

নির্দেশনা অনুযায়ী:
গরু, ষাঁড়, বলদ, বাছুর বা নির্দিষ্ট মহিষ জবাইয়ের পূর্বে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ‘ফিটনেস’ বা জবাইয়ের সনদ নিতে হবে।
কেবলমাত্র ১৪ বছরের বেশি বয়সী, কাজের বা প্রজননের স্থায়ীভাবে অনুপযোগী কিংবা দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত পশুকে জবাইয়ের উপযুক্ত হিসেবে সনদ দেওয়া যাবে।
খোলা জায়গায় পশু জবাই পুরোপুরি নিষিদ্ধ এবং কেবল পৌরসভা অনুমোদিত জবাইখানাতেই এটি করা সম্ভব।

ঈদের ঠিক আগমুহূর্তে জারি হওয়া এই নির্দেশনার পর থেকেই বাজারে গরুর মাংসের আকাল দেখা দেয়, যা তিন মাস পেরিয়ে গেলেও স্বাভাবিক হয়নি।

আকাশছোঁয়া দাম, অর্ধেকের নিচে বিক্রি
সরবরাহ সংকটের কারণে বাজারে গরুর মাংসের দাম লাফিয়ে বেড়েছে।

পূর্বে যেখানে প্রতি কেজি মাংস ২০০ থেকে ২৫০ রুপিতে পাওয়া যেত, তা বর্তমানে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৫০ থেকে ৫০০ রুপিতে।
রেস্তোরাঁগুলোতে মাংসের পদগুলোর দাম বাড়লেও বিক্রি কমেছে প্রায় ৫০ শতাংশ।

ব্যবসায়ীরা জানান, পর্যাপ্ত জোগান না থাকায় মাংসের গুণগত মান বজায় রাখা যাচ্ছে না। ফলে স্টু বা চাপের মতো বিশেষ পদগুলো বাদ দিয়ে কেবল সাধারণ ভুনা মাংসের মধ্যেই মেনু সীমাবদ্ধ রাখা হচ্ছে। এছাড়া বাইরে এসে গরুর মাংস খাওয়ার ক্ষেত্রেও অনেক ক্রেতার মধ্যে এক ধরনের ভীতি কাজ করছে।

জটিলতা লাইসেন্স নবায়নেও
কেবল জবাইয়ের সনদ নয়, মাংস বিক্রির প্রাতিষ্ঠানিক লাইসেন্স নবায়ন নিয়েও তৈরি হয়েছে প্রশাসনিক জটিলতা। কলকাতা পৌর করপোরেশনের সাম্প্রতিক প্রশাসনিক রদবদলের কারণে বহু ব্যবসায়ীর ট্রেড লাইসেন্স আটকে রয়েছে। বংশপরম্পরায় এই ব্যবসার সাথে যুক্ত ব্যবসায়ীদের দাবি, অতীতে কোনো সরকারের সময়ে তাদের এমন অচলাবস্থার মুখে পড়তে হয়নি।

বিখ্যাত রেস্তোরাঁর মেনু থেকে বাদ গরুর মাংস
সংকটের প্রভাব পড়েছে শহরের নামী রেস্তোরাঁগুলোতেও। পার্ক সার্কাস এলাকার দোকানগুলোতে ব্যবসা কমেছে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ। 

শহরের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ‘জাম জাম রেস্তোরাঁ’ মাংসের গুণগত মানের নিশ্চয়তা না পাওয়ায় তাদের তিনটি শাখার মেনু থেকেই গরুর মাংসের সমস্ত পদ সাময়িকভাবে বাদ দিয়েছে। এতে প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ৪০ শতাংশ লোকসান হচ্ছে এবং কর্মী ছাঁটাইয়ের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। 

একইভাবে, ১৯৪৭ সাল থেকে পরিচালিত পার্ক স্ট্রিটের ঐতিহ্যবাহী ‘ওলিপাব’-এর জনপ্রিয় গরুর মাংসের স্টেকও এখন আর নিয়মিত পাওয়া যাচ্ছে না; মাংসের সরবরাহ পেলেই কেবল তা তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে।

দায় ঠেলাঠেলিতে পুরসভা ও প্রাণিসম্পদ দপ্তর
ট্যাংরা জবাইখানা পুনরায় চালু ও লাইসেন্স নবায়ন প্রসঙ্গে কলকাতা পুরসভার প্রশাসনিক প্রধান স্মিতা পান্ডের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি জানান, বিষয়টি প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন দপ্তরের এখতিয়ারভুক্ত। 

অন্যদিকে, রাজ্য প্রাণিসম্পদ ও পশুচিকিৎসা বিভাগের পরিচালক নিখিল কুমার শিটের দাবি, জবাইখানা পরিচালনা ও লাইসেন্স প্রদানের মূল দায়িত্ব পুরসভার। ফলে দুই প্রশাসনিক সংস্থার সমন্বয়হীনতায় ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

জেলা ও নিম্নবিত্তের হেঁশেলে টান
কলকাতার বাইরের চিত্র আরও নাজুক। দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুরে বেলা বাড়ার আগেই মাংস শেষ হয়ে যাচ্ছে। এক স্থানীয় বাসিন্দা জানান, আগে সাশ্রয়ী হওয়ায় গরুর মাংসের ওপর তাদের পরিবার নির্ভরশীল ছিল। এখন সেই খরচ প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যাওয়ায় তারা খাদ্য তালিকা থেকে মাংস কমিয়ে সস্তা মাছ ও সবজির দিকে ঝুঁকছেন।

মালদা জেলায় গরুর মাংস কেনাবেচা এক প্রকার গোপন নেটওয়ার্কের রূপ নিয়েছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। পুলিশি তল্লাশি ও আইনি জটিলতার ভয়ে অনেকেই প্রকাশ্যে মাংস বিক্রিতে জড়াতে চাইছেন না।

খাদ্যসংস্কৃতির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ
ভারতের অন্যতম বৃহৎ মাংসের বাজার পশ্চিমবঙ্গে শুধু ধর্মীয় জনগোষ্ঠী নয়, দলিত ও আদিবাসীসহ নানা সম্প্রদায়ের খাদ্যসংস্কৃতির অংশ ছিল এই খাবার। কিন্তু বিধিনিষেধ, দামের ঊর্ধ্বগতি এবং সামাজিক ভীতি দীর্ঘদিনের এই খাদ্যসংস্কৃতিকে ক্রমশ অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।