ভাঙ্গায় সড়কের মরণফাঁদ: ৮ মাসে ঝরল ৫২ প্রাণ, ঝুঁকিতে তরুণরা

নুরুল ইসলাম, স্টাফ রিপোর্টারঃ
৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৪:৪৭ পিএম
শেয়ার করুন:
ভাঙ্গায় সড়কের মরণফাঁদ: ৮ মাসে ঝরল ৫২ প্রাণ, ঝুঁকিতে তরুণরা

পদ্মা সেতু চালুর পর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার প্রবেশদ্বার হয়ে ওঠা ফরিদপুরের ভাঙ্গা এখন নিত্যদিনের এক আতঙ্কের জনপদ। দ্রুতগামী যানবাহনের বেপরোয়া গতি, অপ্রশস্ত সেতু ও ট্রাফিক আইনের তোয়াক্কা না করার কারণে মহাসড়কগুলো যেন পরিণত হয়েছে ‘মরণফাঁদে’। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত মাত্র আট মাসে ছোট-বড় অর্ধশতাধিক দুর্ঘটনায় অন্তত ৫২ জনের প্রাণহানি ঘটেছে; আহত হয়েছেন আরও অন্তত ৩০ জন। 

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, প্রাণ হারানোদের একটি বড় অংশই তরুণ ও কিশোর। সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, কেবল গত এক সপ্তাহেই বেপরোয়া মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে ৮ জন যুবকের।

চার মাসেই ৩৩ মৃত্যু  
ভাঙ্গা হাইওয়ে থানা ও স্থানীয় সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের আট মাসে ভাঙ্গায় প্রায় ৫০ থেকে ৬০টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। মাসের হিসাবে—জানুয়ারিতে ২, ফেব্রুয়ারিতে ৩, মার্চে ৬ এবং এপ্রিলে ৮ জন প্রাণ হারান। তবে মে মাস থেকে আগস্ট—এই চার মাসেই মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হয়ে ওঠে। এর মধ্যে মে মাসে ৯, জুনে ৮, জুলাইয়ে ৬ এবং আগস্টে সর্বোচ্চ ১১ জনের মৃত্যু হয়। চার মাসেই প্রাণ গেছে ৩৩ জনের।

ঝুঁকি বাড়াচ্ছে গতি ও সংকীর্ণ সেতু 
পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ে হয়ে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রবেশমুখ ভাঙ্গায় যানবাহনের চাপ বহুগুণ বেড়েছে। ব্যস্ত এই যোগাযোগ করিডোরে যানবাহনের বাড়তি চাপের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ সড়ক ও সেতুর সংকীর্ণতা ঝুঁকি মারাত্মকভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে। 

ভাঙ্গা-বরিশাল মহাসড়কে এখনো চার লেনের বদলে রয়ে গেছে দুটি লেনের চারটি পুরোনো সেতু। এর মধ্যে বাবনতলা, শড় ও চঁপা সেতু এলাকায় প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে। দূরপাল্লার দ্রুতগামী বাস ও পণ্যবাহী ট্রাক যখন এক্সপ্রেসওয়ে থেকে হঠাৎ করে এসব সংকীর্ণ সেতুতে প্রবেশ করে, তখনই চালকরা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন।

আইন অমান্য ও অবৈধ থ্রি-হুইলারের দৌরাত্ম্য  
হাইওয়েতে নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও ব্যাটারিচালিত রিকশা, ইজিবাইক ও নছিমন-করিমনসহ বিভিন্ন অবৈধ থ্রি-হুইলার হরহামেশাই চলছে। উল্টো পথে চলাচল এবং চালকদের ট্রাফিক আইন না মানার প্রবণতা দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। এছাড়া এক্সপ্রেসওয়ে ও হাইওয়েতে তরুণদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালনা এবং পণ্যবাহী ভারী ট্রাকের লাগামহীন গতি সড়ককে দিন দিন রক্তক্ষয়ী করে তুলছে।

পুলিশ প্রশাসনের বক্তব্য 
এ বিষয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ভাঙ্গা সার্কেল) রেজওয়ান দীপু বলেন, “দক্ষিণাঞ্চলের প্রবেশদ্বার হওয়ায় ভাঙ্গার ওপর দিয়ে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক যানবাহন চলাচল করে। এই অতিরিক্ত চাপের কারণেই মাঝেমধ্যে দুর্ঘটনা ঘটছে। তবে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে এবং দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে জেলা পুলিশ ও হাইওয়ে পুলিশ যৌথভাবে কাজ করছে। ঝুঁকিপূর্ণ জায়গাগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।”

প্রশস্ত সড়ক ও কঠোর প্রয়োগের দাবি 
স্থানীয় বাসিন্দা ও নিরাপদ সড়ক সংশ্লিষ্টদের দাবি—শুধু পুলিশি তৎপরতাই যথেষ্ট নয়। ভাঙ্গা-বরিশাল মহাসড়কের সংকীর্ণ সেতু ও কালভার্টগুলো অবিলম্বে চার লেনে রূপান্তর করতে হবে। একই সঙ্গে মহাসড়কে অবৈধ থ্রি-হুইলার চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ, মোটরসাইকেলের গতি নিয়ন্ত্রণে স্পিড রাডার ও ক্যামেরার ব্যবহার এবং ট্রাফিক আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা না গেলে এই রক্তক্ষরণ থামানো সম্ভব হবে না।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।