বরিশালে ডিবি পুলিশের বিরুদ্ধে ‘আটক বাণিজ্য’ ও চাঁদা দাবির অভিযোগ

মোঃ মনিরুজ্জামান, অগৈলঝরা প্রতিনিধি, বরিশালঃ
১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৬:৫৮ পিএম
শেয়ার করুন:
বরিশালে ডিবি পুলিশের বিরুদ্ধে ‘আটক বাণিজ্য’ ও চাঁদা দাবির অভিযোগ

বরিশাল জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মাদকবিরোধী অভিযানের নামে নিরীহ মানুষকে আটকে চাঁদা আদায় এবং টাকা না দিলে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এমনকি বাড়ি থেকে এক যুবককে তুলে নিয়ে সাড়ে ৫ কিলোমিটার দূরের ভিন্ন এলাকা দেখিয়ে ১০১ পিস ইয়াবাসহ চালান দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এছাড়া স্থানীয় ব্যবসায়ী ও খামারিদের কাছে নিয়মিত চাঁদা দাবি এবং চাঁদা না দিলে অস্ত্র মামলায় ফাঁসানোর হুমকি দেওয়ারও অভিযোগ উঠেছে। 

ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়ে বরিশাল রেঞ্জ ডিআইজির কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ভুক্তভোগী জাফর হাওলাদার। 

অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, আগৈলঝাড়া উপজেলার রত্নপুর ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের মোল্লাপাড়া ও এর আশপাশের এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে জেলা ডিবি পুলিশের এসআই আফজাল ও এএসআই রাজিব পাল সাধারণ মানুষকে হয়রানি করে আসছেন। অভিযোগ রয়েছে, চিহ্নিত মাদক কারবারি নয়ন ঢালী ও সাহিন সরদারকে ‘সোর্স’ হিসেবে ব্যবহার করে সাদা পোশাকে এলাকায় নিয়মিত ‘আটক বাণিজ্য’ চালান তারা।

লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, গত ১১ আগস্ট রাতে মোল্লাপাড়ায় ওয়ার্ড বিএনপি নেতা জাফর হাওলাদারের বাড়িতে অভিযান চালায় ডিবি পুলিশ। সেখান থেকে জাফরের ছেলে নাদিম, প্রতিবেশী সাব্বির ও সোহাগকে আটক করা হয়। এর আগে সাহেবের হাট বাজার থেকে তাদের সোর্স নয়ন ঢালী ও সাহিন সরদারকেও হাতকড়া পরিয়ে ওই বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। পরে নাদিমকে ছাড়তে ২ লাখ টাকা এবং অন্যদের প্রত্যেকের কাছে ৩০ হাজার টাকা দাবি করা হয়। 

ডিবি পুলিশের সোর্স হিসেবে পরিচিত নয়ন ঢালী জানান, "অভিযানের সময় কারও কাছেই কোনো মাদক পাওয়া যায়নি। ডিবি পুলিশ উল্টো আমার পকেট থেকে ১২ হাজার টাকা নিয়ে যায় এবং পরে বিকাশে আরও ২ হাজার টাকা নেয়। নাদিমের কাছেও কিছু পাইনি, অথচ এসআই আফজাল তাকে ১০১ পিস ইয়াবাসহ চালান করে দিয়েছেন।"

এদিকে মামলার ঘটনাস্থল বদলে ফেলার চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন খোদ মামলার ১ নম্বর সাক্ষী লাল মিয়া। তিনি বলেন, "সে রাতে মোল্লাপাড়ায় জাফরের বাড়ি থেকেই নাদিমকে ধরে নিয়ে যায় পুলিশ। কিন্তু মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে গৌরনদী উপজেলার মাহিলাড়া থেকে তাকে আটক করা হয়েছে। এই দুই স্থানের দূরত্ব প্রায় সাড়ে পাঁচ কিলোমিটার। দুটি আলাদা ঘটনা ও স্থানকে পুলিশ কীভাবে এক মামলায় নিয়ে এলো, তা বোধগম্য নয়।"

এলাকার খামারি কাওছার হোসেন অভিযোগ করেন, "এসআই আফজাল ও রাজিব পাল ভয়ভীতি দেখিয়ে এর আগেও আমার কাছ থেকে ৫৫ হাজার টাকা নিয়েছেন। এখন প্রতি মাসে নিয়মিত চাঁদা দাবি করছেন, না দিলে অস্ত্র ও মাদক মামলায় ফাঁসানোর হুমকি দিচ্ছেন। আতঙ্কে এখন আমি বাড়িছাড়া হয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছি।"

ভুক্তভোগী জাফর হাওলাদার বলেন, "টাকা না দেওয়ায় আমার ছেলেকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে মাহিলাড়া এলাকা দেখিয়ে মিথ্যা মামলায় চালান দেওয়া হয়েছে। পুলিশের বেপরোয়া চাঁদাবাজি ও হয়রানির কারণে মোল্লাপাড়া গ্রাম এখন প্রায় পুরুষশূন্য। এ ঘটনার প্রতিকার চেয়ে ডিআইজির কাছে অভিযোগ দেওয়ায় উল্টো আমাকেও মামলায় জড়ানোর হুমকি দেওয়া হচ্ছে।"

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত এসআই আফজাল বলেন, "ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া আগৈলঝাড়ার ওই ঘটনার বিষয়ে আমি কোনো বক্তব্য দিতে পারব না।"

এ বিষয়ে বরিশাল রেঞ্জ ডিআইজি জুলফিকার আলী হায়দার বলেন, "এ সংক্রান্ত একটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। পুরো বিষয়টি এবং মামলার নথি পর্যালোচনা করে দেখা হচ্ছে। এক স্থান থেকে আটক করে মামলায় অন্য স্থান দেখানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।" তিনি আরও জানান, কোনো পুলিশ সদস্যের অপেশাদার আচরণের প্রমাণ পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।