জয়তু স্পেন

অনলাইন ডেস্কঃ
২২ জুলাই, ২০২৬ ১২:১৩ পিএম
শেয়ার করুন:
জয়তু স্পেন

১৬ বছর আগের এক শান্ত রাতে যুক্তরাষ্ট্রের কানেকটিকাটের এক ঘরে বসে ল্যাপটপে আন্দ্রেস ইনিয়েস্তার সেই ঐতিহাসিক সোনালি গোলটি দেখছিলেন ১৪ বছরের এক কিশোর। আনন্দে আত্মহারা হয়ে সেদিন লেকের চারপাশ জুড়ে দৌড়েছিলেন তিনি। ঠিক ১৬ বছর পর, সেই কিশোর রদ্রি নিজেই নিউজার্সির সবুজ গালিচায় দাঁড়িয়ে বিশ্বজয়ের ট্রফি উঁচিয়ে ইতিহাসের পাতায় নিজের নাম লিখলেন। ২০১০ সালের পর ২০২৬ বিশ্বকাপে এসে নিজেদের জার্সিতে দ্বিতীয় তারকা যোগ করার আনন্দে এখন ভাসছে পুরো স্পেন।

বিশ্বজয়ের পর সোমবার স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদ রূপ নিয়েছিল এক লাল সমুদ্রে। মনক্লোয়া থেকে সিবেলেস স্কয়ার পর্যন্ত প্রায় ২০ লাখ মানুষ নেমে এসেছিলেন প্রিয় নায়কদের বরণ করে নিতে। ‘বিশ্বের রাজা’ লেখা ছাদখোলা বাসে চেপে বিশ্বজয়ীরা যখন ট্রফি উঁচিয়ে এগোচ্ছিলেন, বাসের সামনে তখন গাভির পাশে পা ঝুলিয়ে বসেছিলেন টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় রদ্রি। 

মাদ্রিদে ফিরে রাজপরিবার ও প্রধানমন্ত্রীর সংবর্ধনা শেষে বাসের ছাদে উঠে মাইক হাতে রদ্রি আবেগাপ্লুত কণ্ঠে চিৎকার করে ওঠেন, "স্পেন, আমরা বিশ্বজয়ী! আমাদের জন্ম দেওয়া মায়েদের জয় হোক, রাজার জয় হোক এবং জয় হোক স্পেনের!" শৈশবের স্মৃতিকাতরতা ছুঁয়ে তিনি আরও বলেন, "আমাদের প্রজন্ম ক্যাসিয়াস আর ইনিয়েস্তাকে কাপ তুলতে দেখে বড় হয়েছে। দেশের হয়ে বিশ্বকাপ জেতাই পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর অনুভূতি।" হাঁটুর চোট সারিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর কষ্টের কথা মনে করে সতীর্থদের উদ্দেশ্যে এই মিডফিল্ডার বলেন, "আছাড় খেয়ে পড়ে গেলেও ঘুরে দাঁড়ানোর একটা কারণ সব সময় থাকে।"

বিজয় প্যারেড শুরুর আগে স্পেনের রাজা ষষ্ঠ ফিলিপ বিশ্বজয়ী লা রোহা তারকাদের বুকে জড়িয়ে ধরে অভিনন্দন জানান। তিনি বলেন, "তোমরা তোমাদের অধ্যবসায়, ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষমতা এবং সাহসিকতা দেখিয়েছ। মস্তিষ্ক আর হৃদয়ের এক চমৎকার মেলবন্ধন ঘটিয়েছ তোমরা।"

অন্যদিকে, স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ ইতিমধ্যে ২০৩০ বিশ্বকাপের নতুন লক্ষ্য বেঁধে দিয়েছেন। তিনি বলেন, "ফাইনালে উঠে দুটি ফাইনালের দুটিতেই জয়! ২০৩০ সালে আমরা যখন বিশ্বকাপের যৌথ স্বাগতিক, তখন কেন আমরা তৃতীয় শিরোপার স্বপ্ন দেখব না?"

রাত ১০টায় সিবেলেস স্কয়ার যখন এক বিশাল উন্মুক্ত স্টেডিয়ামের রূপ নেয়, বিশ্বজয়ী শিষ্যরা তখন তাঁদের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তেকে শূন্যে ছুড়ে উল্লাসে মেতে ওঠেন। মাইক হাতে গান গেয়ে সবাইকে হাসিয়ে দিয়ে কোচ সমর্থকদের উদ্দেশ্যে আবেগপ্রবণ কণ্ঠে বলেন, "আমাদের এই সাফল্যকে এত কাছ থেকে অনুভব করার জন্য ধন্যবাদ; কারণ, এই সাফল্য আপনাদেরও। একসঙ্গে আমরা আরও শক্তিশালী।" উৎসবের মাঝেই ডিজিটাল স্ক্রিনে ভেসে ওঠে বিশ্বখ্যাত পপ তারকা শাকিরার বিশেষ অভিনন্দন বার্তা। তিনি বলেন, "স্পেন বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছে যে কীভাবে এক মন আর এক প্রাণ হয়ে কাজ করতে হয়।"

এই ঐতিহাসিক শিরোপার পেছনে লুকিয়ে ছিল কতগুলো ব্যক্তিগত ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প। যে ফেরান তোরেসকে একসময় পুরো দেশ তীব্র সমালোচনায় বিদ্ধ করেছিল, নিউজার্সির ফাইনালে ১০৬তম মিনিটে তাঁর নেওয়া দুর্দান্ত শটটিই শেষ পর্যন্ত স্পেনের আকাশে দ্বিতীয় তারকা হয়ে ফুটে ওঠে। নিজের অতীতের কষ্টের দিনগুলোর কথা মনে করে আবেগপ্রুত তোরেস বলেন, "ভাগ্য আগে থেকেই লেখা থাকে। ঈশ্বর তাদেরই দেন, যারা এর যোগ্য।"

রাজপথে দাঁড়িয়ে থাকা ১৪ বছরের খুদে ফুটবল ভক্ত হেক্তর মোয়ার চোখেমুখে ছিল বিস্ময়। সে কেবল একটি কথাই বলতে পেরেছিল, "কারও মুখ থেকে গল্প শোনার চেয়ে এই গৌরবময় দিনটি নিজের চোখে দেখার অনুভূতি একদমই আলাদা!"

বিশ্বজয়ের এই অবিস্মরণীয় অনুভূতির কাছে আসলেই কি অন্য কোনো কিছুর তুলনা চলে? স্পেনের এই রাজকীয় উৎসব যেন সেই কথাই প্রমাণ করে গেল।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।