দৌলতপুরে লোকজ ঐতিহ্য ‘পদ্মা পুরাণ’ পরিবেশনায় যুবকের বাধা, পরে স্থানীয়দের উদ্যোগে সম্পন্ন

দৌলতপুর প্রতিনিধিঃ মোঃ হারুন অর রশীদ
৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৬:৫৯ পিএম
শেয়ার করুন:
দৌলতপুরে লোকজ ঐতিহ্য ‘পদ্মা পুরাণ’ পরিবেশনায় যুবকের বাধা, পরে স্থানীয়দের উদ্যোগে সম্পন্ন

গ্রামবাংলার বিলুপ্তপ্রায় শত বছরের ঐতিহ্যবাহী লোকজ গান ‘পদ্মা পুরাণ’ (মনসামঙ্গল) আয়োজনকে কেন্দ্র করে কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। অনুষ্ঠান চলাকালে স্থানীয় এক যুবকের বাধা ও ফেসবুক লাইভে আপত্তিকর মন্তব্যের জেরে গান বন্ধ হয়ে যায়। তবে পরদিন সকালে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের হস্তক্ষেপে সীমিত পরিসরে আয়োজনটি সম্পন্ন হয়েছে।

ঘটনাটি ঘটেছে উপজেলার তারাগুনিয়া ইউনিয়নের শালিমপুর গ্রামে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি এলাকায় সাপের উপদ্রব বেড়ে যাওয়ায় গ্রামীণ লোকবিশ্বাস ও প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী তা থেকে পরিত্রাণের আশায় ‘পদ্মা পুরাণ’ গানের আয়োজন করেন মুন্নি খাতুন নামের এক নারী। শুক্রবার সন্ধ্যায় গান চলাকালে শরিফুল ইসলাম শরীফ নামের স্থানীয় এক যুবক ফেসবুক লাইভে এসে অনুষ্ঠানের তীব্র বিরোধিতা করেন। সংস্কৃতির নামে কুসংস্কার ও অপসংস্কৃতি ছড়ানো হচ্ছে—এমন অভিযোগ তুলে তিনি অনুষ্ঠান বন্ধের দাবি জানান। একপর্যায়ে গান পরিবেশনা বন্ধ হয়ে গেলে আয়োজক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।

আয়োজক মুন্নি খাতুন বলেন, “মাঝেমধ্যেই স্বপ্নে দেখতাম বেশ কিছু সাপ এসে আমাকে কামড়াতে আসছে। বিষয়টি আমার মাকে জানানোর পর স্থানীয় ওঝার পরামর্শে আমরা পদ্মা পুরাণ গানের আয়োজন করি। এর আগেও ঘর থেকে একাধিকবার সাপ উদ্ধার ও মারা হয়েছে। কিন্তু উপদ্রব না কমায় বাধ্য হয়ে এই গানের আয়োজন করেছিলাম। গান চলাকালে এক যুবক এসে বাধা দিলে শিল্পীরা তাৎক্ষণিক গান বন্ধ করে দেন। পরে শনিবার সকালে সীমিত পরিসরে অনুষ্ঠানটি শেষ করা হয়।”

স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, ‘পদ্মা পুরাণ’ গ্রামবাংলার প্রাচীন লোকসংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। কোনো আয়োজনে কুসংস্কার বা আপত্তিকর কিছু থাকলে তা আলোচনার মাধ্যমে যাচাই করা যেতে পারে; কিন্তু কোনো তদন্ত ছাড়া হুট করে শত বছরের ঐতিহ্যবাহী লোকজ আয়োজন বন্ধ করে দেওয়া সমীচীন নয়।

অনুষ্ঠানের শিল্পী মো. খাইরুল ইসলাম বলেন, “মনসার গান সাধারণত শখের বশে কেউ করে না। অতিমাত্রায় বিপদে পড়লে মানুষ গ্রামীণ বিশ্বাস থেকে এ ধরনের গানের আয়োজন করে থাকে। শত বছরের এই লোকঐতিহ্যকে এভাবে অবজ্ঞা বা বাধা দেওয়া দুঃখজনক।”

অন্যদিকে অনুষ্ঠান বন্ধের দাবি তোলা শরিফুল ইসলাম শরীফ নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করে বলেন, “গ্রামের কিছু ছেলে মেয়ে সেজে অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি করে নাচ-গান করছিল। ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে মনে হয়েছে, পদ্মা পুরাণ গান সরাসরি শিরকের সমতুল্য। গ্রামবাসীকে শিরক ও অনৈসলামিক কাজ থেকে সতর্ক করতেই আমি প্রতিবাদ জানিয়েছি; কারো ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়া আমার উদ্দেশ্য ছিল না।”

এ বিষয়ে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ তুলে ধরে তারাগুনিয়া বাজার জামে মসজিদের ইমাম মোহাম্মদ আল আমিন বলেন, “ইসলামে এ ধরনের গান-বাজনার কোনো স্থান নেই। তাছাড়া পুরুষদের নারী সেজে অশালীন নৃত্য কোনোভাবেই ইসলাম সমর্থন করে না।” 

একই সুর মিলিয়ে তারাগুনিয়া শাহী মসজিদের খতিব মোহাম্মদ নুরুল আমিন বলেন, “পদ্মা পুরাণ গান ইসলামি শরিয়াহ সমর্থিত নয়, এটি মানুষের ভুল ধারণা মাত্র। গানের মাধ্যমে সাপের উপদ্রব থেকে রক্ষা পাওয়া যায় না, বরং এটি মানুষকে শিরকের দিকে ধাবিত করে।”

শুক্রবার রাতে অনুষ্ঠানটি বন্ধ হয়ে গেলেও শনিবার সকালে স্থানীয় প্রবীণ ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের মধ্যস্থতায় সীমিত পরিসরে পুনরায় গানটি পরিবেশন করে নির্ধারিত আয়োজন শেষ করা হয়। স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, আধুনিকতার পাশাপাশি নিজস্ব লোকঐতিহ্য রক্ষা করা জরুরি এবং যেকোনো মতবিরোধ সামাজিকভাবে আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান হওয়া উচিত।

এ বিষয়ে দৌলতপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অনিন্দ্য গুহ বলেন, “গানের নামে যদি কোনো ধরনের চাঁদাবাজি বা বেআইনি কর্মকাণ্ড না ঘটে, তবে এ ধরনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বন্ধ করা আইনসম্মত নয়। শত বছরের পুরনো ঐতিহ্যবাহী লোকজ গান বন্ধ হয়ে যাক, প্রশাসনও তা চায় না। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।