আত্রাইয়ে জ্বালানি সংকট, দীর্ঘ সময়ে লাইনে দাঁড়িয়ে কিঞ্চিৎ তেল মিললেও খোলা বাজারে বেশি দামে পাওয়া যাচ্ছে সেই তেল

আব্দুল মজিদ মল্লিক, জেলা প্রতিনিধি, নওগাঁঃ
Apr 3, 2026 - 20:17
Apr 3, 2026 - 20:17
আত্রাইয়ে জ্বালানি সংকট, দীর্ঘ সময়ে লাইনে দাঁড়িয়ে কিঞ্চিৎ তেল মিললেও খোলা বাজারে বেশি দামে পাওয়া যাচ্ছে সেই তেল

নওগাঁর আত্রাই উপজেলার পালশা এলাকায় অবস্থিত নূর বানু ফিলিং স্টেশনকে ঘিরে তীব্র জ্বালানি সংকট দিন দিন ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। উপজেলায় একটি মাত্র তেলের পাম্প হওয়ায় চলমান এই সংকট এখন স্থানীয় জনজীবনে মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে।

তেল না পেয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন মোটরসাইকেল চালক, পেশাজীবী, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ। প্রতিদিন শত শত মানুষ তেলের আশায় ভিড় জমালেও অধিকাংশই হতাশ হয়ে ফিরছেন—যা পুরো এলাকায় উদ্বেগজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, সপ্তাহে দুই -তিন দিন বিকেল থেকে তেল সরবরাহ করার ঘোষণা দেওয়া হলেও গভীর রাত পর্যন্ত থেকে অনেকে তেল না পেয়ে শূন্য হাতে ফিরছে হতাশ হয়ে। আগেই তেল নেওয়ার আশায় ফিলিং স্টেশনের সামনে দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়। সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই লাইন কয়েকশ’ মিটার ছাড়িয়ে আশপাশের সড়ক পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। যারা পাচ্ছেন, তাদের দেওয়া হচ্ছে মাত্র ২০০ টাকার তেল। এতে করে দৈনন্দিন যাতায়াত, পেশাগত কাজকর্ম এবং জরুরি প্রয়োজনে চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দা সাগর আলী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তিন দিন ধরে মোটরসাইকেল নিয়ে এসে বিশাল লাইন দেখে ফিরে গেছি।দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে এত কষ্ট করেও নিশ্চিত নই তেল পাব কি না। আমাদের মতো সাধারণ মানুষের কষ্টটা কেউ বুঝছে না।কিন্তু উপজেলার কিছু বাজারে বেশি দামে পাওয়া যাচ্ছে তেল।এই তেল গুলো তাঁরা কোথায় পাচ্ছে তাহা সাধারণ মানুষের প্রশ্ন। 

ঔষধ কোম্পানির প্রতিনিধি মিজানুর রহমান বলেন, “আমাদের প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিভিন্ন এলাকায় যেতে হয়। কিন্তু তেলের অভাবে কাজ সম্পূর্ণভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও প্রয়োজন অনুযায়ী তেল পাওয়া যাচ্ছে না। অফিসে জবাবদিহি করতে হচ্ছে, যা আমাদের জন্য অত্যন্ত বিব্রতকর।

শুধু ব্যক্তিগত যানবাহনই নয়, তেলের সংকটের কারণে স্থানীয় পরিবহন ব্যবস্থাও প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। মোটরসাইকেল ও অন্যান্য ছোট যানবাহনের চালকেরা পর্যাপ্ত তেল না পেয়ে নিয়মিত যাত্রী পরিবহন করতে পারছেন না। ফলে যাত্রীরা পড়ছেন চরম ভোগান্তিতে। অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ভাড়া গুনতে হচ্ছে, আবার কোথাও কোথাও যাতায়াতই বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম। শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী ও রোগীদের জন্য এই সংকট বিশেষ দুর্ভোগ ডেকে এনেছে।

এদিকে, দীর্ঘ সময় অপেক্ষা, সীমিত সরবরাহ এবং অনিশ্চয়তার কারণে স্টেশন এলাকায় মাঝে-মধ্যেই উত্তেজনা সৃষ্টি হচ্ছে। তেল সংগ্রহকে কেন্দ্র করে গ্রাহকদের মধ্যে বাকবিতণ্ডা ও সংঘর্ষের আশঙ্কা বাড়ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নিয়মিত হস্তক্ষেপ করতে হচ্ছে।

তবে গত ১লা এপ্রিল থেকে সরকারি নির্ধারিত দামে তেল বিক্রির জন্য ফিলিং স্টেশন গুলোতে ট্যাগ অফিসার নিয়োগ করা হয়েছে। 

মোতায়ন করা হয়েছে পুলিশ “প্রতিদিন এখানে বিপুল সংখ্যক মোটরসাইকেল জমা হচ্ছে। তেলের স্বল্পতার কারণে মানুষের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে, যা কখনো কখনো উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করছে। আমরা নিয়মিত উপস্থিত থেকে সিরিয়াল বজায় রাখার চেষ্টা করছি এবং কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা যাতে না ঘটে, তা নিশ্চিত করছি।”

এ উপজেলা বিল বেষ্টত হওয়ায় এখানে ডিজেল ইঞ্জিনে সেচ কাজ করা হয়।বর্তমানে ডিজেল সরবরাহ ঠিক থাকলেও সময় সময় বেশি দামে কৃষকদের ক্রয় করতে হচ্ছে। 

নূর বানু ফিলিং স্টেশন কর্তৃপক্ষ এই সংকটের জন্য সরবরাহ ব্যবস্থাকেই দায়ী করেছেন। তাদের দাবি, উপর মহল থেকে পর্যাপ্ত জ্বালানি না পাওয়ায় চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না।

নূর বানু ফিলিং স্টেশনের স্বত্বাধিকারী মো. সম্রাট হোসেন বলেন,আমি মনে করেছিলাম এ মাস থেকে তেলের সংকট কিছু টা কেটে যাবে কিন্তু না

আমি নিজেও এই পরিস্থিতিতে বিব্রত। উপর থেকে যে পরিমাণ তেল আসে, তা চাহিদার তুলনায় খুবই কম। তাই বাধ্য হয়ে মোটরসাইকেল প্রতি ২০০ টাকার তেল দিচ্ছি। আমি নিজে উপস্থিত থেকে চেষ্টা করছি যেন সবাই কিছুটা হলেও তেল পায়।

তেল নিতে আসা মোটরসাইকেল চালক মো. একরামুল বলেন, আমি সকাল ৯টা থেকে শুরু করে বিকেল ৪টা প্রর্যন্ত যোগাযোগ করছি, তেল নেওয়ার জন্য, ফিলিং স্টেশনে গেলে তারা বলেন, কোন তেল নেই,যখন আমরা তেল পাবো-সংঙ্গে সংঙ্গে জানানো হবে। কখন কি ভাবে জানাবে আমার জানা নেই। 

এলাকাবাসী ও সচেতন মহলের মতে, এই সংকট শুধুমাত্র একটি ফিলিং স্টেশনকেন্দ্রিক নয়, বরং এটি বৃহত্তর জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতার ইঙ্গিত বহন করে। যথাসময়ে পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত না হলে সমস্যা আরও বিস্তৃত হতে পারে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

তাই তারা দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করা, বাজার মনিটরিং জোরদার, বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থা চালু এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর হস্তক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এমন সংকট এড়াতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।

বর্তমান পরিস্থিতিতে আত্রাইবাসী সহ সারা দেশের একটাই প্রত্যাশা, দ্রুত এই তীব্র জ্বালানি সংকটের সমাধান এবং স্বাভাবিক সরবরাহ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। অন্যথায় জনজীবনে এর প্রভাব আরও গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow