এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।
সরাসরি আপনার ইনবক্সে সর্বশেষ খবর, আপডেট এবং বিশেষ অফার পেতে আমাদের গ্রাহক তালিকায় যোগ দিন
বর্ষাকালে আকাশ থেকে বৃষ্টি নামে, পুকুরগুলো পানিতে ভরে ওঠে—উপকূলের জীবনে সাময়িক স্বস্তি ফেরে। কিন্তু বর্ষার রেশ কাটতে না কাটতেই শুরু হয় বেঁচে থাকার এক নির্মম লড়াই। খুলনার কয়রা উপজেলার মানুষের কাছে নিরাপদ সুপেয় পানি আজও এক চরম অনিশ্চয়তার নাম। সুন্দরবনসংলগ্ন এই উপকূলীয় জনপদে চারিদিকে অথৈ জলরাশি থাকলেও এক ফোঁটা মিঠা পানির জন্য গ্রামের নারীদের কলসি কিংবা জার হাতে পাড়ি দিতে হয় মাইলের পর মাইল পথ।
উপজেলার গোবরা গ্রামের বাসিন্দা নার্গিস সুলতানা জানান তাঁর প্রাত্যহিক অভিজ্ঞতার কথা। তিনি বলেন, “বর্ষায় কোনোমতে বৃষ্টির পানি জমিয়ে আর পুকুরের পানি দিয়ে চলে। কিন্তু বর্ষা শেষ হলেই জীবনে বিপর্যয় নেমে আসে। প্রতিদিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে গৃহস্থালির কাজের আগেই ছুটতে হয় মিঠা পানির খোঁজে।”
শুধু গোবরা গ্রামই নয়; মহেশ্বরীপুর, মহারাজপুর, কয়রা সদর, বাগালী এবং উত্তর বেদকাশীসহ সুন্দরবনসংলগ্ন বিস্তীর্ণ জনপদে নিরাপদ পানির সংকট দীর্ঘদিনের। অনেক এলাকায় অগভীর তো বটেই, এমনকি গভীর নলকূপ বসিয়েও মিঠা পানির সন্ধান মেলে না। কোথাও কোথাও কয়েকটি গ্রাম মিলিয়ে মাত্র একটি নলকূপে খাবার পানি পাওয়া যায়। ফলে সেখানে কাকডাকা ভোর থেকেই লেগে থাকে নারীদের দীর্ঘ লাইন।
পানির অর্ধেকের বেশি উৎসে লবণাক্ততা, বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি
সাম্প্রতিক এক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, কয়রার প্রায় ৫৫ দশমিক ৩ শতাংশ পানির উৎসেই মাত্রাতিরিক্ত লবণাক্ততা পাওয়া গেছে। অর্থাৎ এখানকার অর্ধেকেরও বেশি পানির উৎস কোনো না কোনোভাবে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লবণাক্ততার এই সমস্যা এখন আর কেবল স্বাদের অস্বস্তিতে সীমাবদ্ধ নেই, এটি রূপ নিয়েছে জনস্বাস্থ্য ঝুঁকিতে। গবেষণায় দেখা গেছে, উপকূলীয় এলাকার খাবার পানিতে অতিরিক্ত সোডিয়ামের উপস্থিতির কারণে নারীদের মধ্যে ডায়াস্টোলিক রক্তচাপ বৃদ্ধির প্রবণতা বেশি। এ ছাড়া অতিরিক্ত লবণাক্ত পানি গ্রহণের ফলে গর্ভবতী নারীদের উচ্চ রক্তচাপ ও প্রি-এক্ল্যাম্পসিয়ার মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
সংকটের সবচেয়ে বড় শিকার নারী
পানির এই তীব্র সংকটের পুরো চাপ বহন করতে হচ্ছে উপকূলের নারীদের। পুরুষেরা জীবিকার তাগিদে বাইরে ব্যস্ত থাকায় পরিবারের সুপেয় পানি সংগ্রহের গুরুদায়িত্ব চাপে নারীদের কাঁধে। শিক্ষা, উপার্জনমুখী কাজ, সন্তানদের পরিচর্যা কিংবা সামান্য বিশ্রামের জন্য যে সময়টুকু পাওয়ার কথা ছিল, তার একটি বড় অংশই নষ্ট হচ্ছে কয়েক কিলোমিটার হেঁটে এক কলসি পানি সংগ্রহ করতে গিয়ে। ফলে পানির সংকট শুধু পরিবেশগত বিপর্যয় নয়, নারীর ক্ষমতায়ন ও মর্যাদার পথেও এক বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বৃষ্টির পানি ও পুকুর: সংরক্ষণে পরিকল্পনার অভাব
কয়রার মানুষের কাছে বৃষ্টির পানি নিছক প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, বরং শুষ্ক মৌসুমে টিকে থাকার প্রধান অবলম্বন। অনেক পরিবার বাড়ির চাল থেকে পাইপের মাধ্যমে ট্যাংকে বৃষ্টির পানি ধরে রাখে। তবে অধিকাংশ ট্যাংকের ধারণক্ষমতা কম হওয়ায় কয়েক মাস পর সে পানি ফুরিয়ে যায়।
অন্যদিকে, পুকুরের পানিও সারা বছর ব্যবহারযোগ্য থাকে না। বাঁধ ভেঙে লবণাক্ত পানি প্রবেশ, পলির স্তর জমা এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বহু পুকুর নষ্ট হয়ে যায়। বিভিন্ন সময় ‘পন্ড স্যান্ড ফিল্টার’ (পিএসএফ) বা ফিল্টারিং ব্যবস্থা স্থাপন করা হলেও পরবর্তী সময়ে নিয়মিত তদারকি ও পরিষ্কার না করায় সেগুলো অকেজো হয়ে পড়ে।
উপজেলা সদরের মদিনাবাদ ও দেয়াড়া এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলো (এনজিও) অনেক সময় প্রকল্প চালু করে অবকাঠামো তৈরি করে দেয়, কিন্তু প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলে আর কোনো দেখভাল থাকে না। রক্ষণাবেক্ষণের তহবিল ও তদারকির অভাবেই কোটি কোটি টাকার প্রকল্প কয়েক বছরের মাথায় বন্ধ হয়ে যায়।
সংকট উত্তরণে করণীয়
কয়রার পানি সংকটকে দেশের অন্য সাধারণ অঞ্চলের সংকটের সঙ্গে মেলানো যাবে না। এটি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ প্রভাবে সৃষ্টি হওয়া একটি বিশেষ উপকূলীয় সংকট। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও নদীভাঙন প্রতিনিয়ত লবণাক্ততাকে ভূগর্ভস্থ পানির স্তরে ঢুকিয়ে দিচ্ছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশেষজ্ঞরা বেশ কিছু সুপারিশ তুলে ধরেছেন:
১. এলাকাভিত্তিক পানির মানচিত্র তৈরি: কোন গ্রামে ভূগর্ভস্থ পানির কী অবস্থা, কোথায় বৃষ্টির পানি কার্যকর এবং কোন পুকুরগুলো রক্ষা করা যায়—তার ইউনিয়নভিত্তিক বিস্তারিত ‘ওয়াটার ম্যাপিং’ বা তথ্যভাণ্ডার তৈরি করা।
২. বৃহৎ পরিসরে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ: ব্যক্তিপর্যায়ের পাশাপাশি প্রতিটি ঝুঁকিপূর্ণ গ্রামে বড় ধারণক্ষমতার কমিউনিটি রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
৩. টেকসই রক্ষণাবেক্ষণ ও বাজেট: শুধু অবকাঠামো নির্মাণ করলেই দায়িত্ব শেষ নয়; পিএসএফ বা ফিল্টার সচল রাখতে স্থানীয় পর্যায়ে স্থায়ী রক্ষণাবেক্ষণ তহবিল ও প্রশিক্ষিত জনবল নিশ্চিত করা।
৪. নারীদের কার্যকর অংশগ্রহণ: পানি ব্যবস্থাপনার সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী কমিটিতে নারীদের দৃশ্যমান ও কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করা।
দয়া নয়, প্রয়োজন অধিকার ও ন্যায়বিচার
জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাবের জন্য কয়রা বা সুন্দরবন উপকূলের প্রান্তিক মানুষের কোনো দায় নেই বললেই চলে; অথচ বৈশ্বিক এই সংকটের সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হচ্ছে তাদেরই। স্থানীয়দের মতে, সুপেয় পানি পাওয়া কোনো অনুকম্পা বা দয়া নয়, এটি মৌলিক মানবাধিকার।
চারপাশে থৈ থৈ নোনা জল থাকলেও এক ফোঁটা সুপেয় পানির জন্য যে জনপদের মানুষকে প্রতিদিন অনিশ্চয়তায় দিন কাটাতে হয়, সেখানে সংকটটি শুধু প্রকৃতির নয়—বরং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, ব্যবস্থাপনা ও সদিচ্ছার। বর্ষা ফুরিয়ে গেলে উপকূলের মানুষের তৃষ্ণা মেটাতে এখন প্রয়োজন সমন্বিত ও স্থায়ী সমাধান।
রংপুর | ৮ অক্টোবর, ২০২৫
কুষ্টিয়া | ৪ জুন, ২০২৪
নোয়াখালী | ১৬ মার্চ, ২০২৫
মাগুরা | ৫ অক্টোবর, ২০২৪
বান্দরবান | ২৮ জুন, ২০২৫
মাগুরা | ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
মতামত | ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
আন্তর্জাতিক | ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
বান্দরবান | ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
নওগাঁ | ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।