জমি-জমার জাল দলিল শনাক্ত করার নিয়ম

অনলাইন ডেস্কঃ
৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:৪৭ পিএম
শেয়ার করুন:
জমি-জমার জাল দলিল শনাক্ত করার নিয়ম

বাংলাদেশে জমি কেনাবেচায় সামান্য অসতর্কতা ডেকে আনতে পারে চরম দুর্ভোগ। জাল বা ভুয়া দলিলের ফাঁদে পড়ে অনেকেই কষ্টার্জিত সঞ্চয় হারিয়ে বছরের পর বছর আদালত ও ভূমি অফিসের বারান্দায় ঘুরে নিঃস্ব হচ্ছেন। বিশেষ করে ২০০৫ সালের ১ জুলাইয়ের আগের দলিলগুলো নিয়ে এ ধরনের জালিয়াতি ও আইনি জটিলতা বেশি দেখা যায়।

অসাধু কর্মচারী ও চক্রের সহায়তায় ভুয়া মালিক সাজিয়ে জমি রেজিস্ট্রি করা, আদালতের বণ্টননামা ছাড়াই ওয়ারিশদের (বিশেষ করে বোনদের) বঞ্চিত করা কিংবা মৃত ও প্রবাসীদের জমি হাতিয়ে নেওয়ার মতো ঘটনা অহরহ ঘটছে। এছাড়া ঘষামাজা, ওভাররাইটিং কিংবা দলিলের ভেতরের পাতা ও তথ্য বদলে ফেলে জালিয়াতির ঘটনাও ঘটে। তাই জমি কেনার আগেই দলিলটি আসল নাকি জাল, তা যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি।

এ বিষয়ে কার্যকর দিকনির্দেশনা দিয়েছেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের প্রখ্যাত আইনজীবী ও আইন গবেষক ড. পি. এম. সিরাজুল ইসলাম (সিরাজ প্রামাণিক)। তাঁর রচিত ‘জমি-জমা নিয়ে আপনার যত আইনি সমস্যা ও তার আইনি সমাধান’ গ্রন্থে জাল দলিল চেনার সহজ ৯টি উপায় বিস্তারিত তুলে ধরেছেন।

জাল দলিল শনাক্তের কার্যকর ৯ উপায়:

১. সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের ভলিউম যাচাই: 
সন্দেহজনক দলিলের তথ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের বালাম বা ভলিউম বইয়ের তথ্য মিলিয়ে নিন। সাধারণত সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিলের ধরন অনুযায়ী চারটি পৃথক ভলিউমে রেকর্ড রাখা হয়। জমি কেনার আগে বিক্রেতার কাছ থেকে সব ‘বায়া দলিল’ (পিঠ দলিল) চেয়ে নিয়ে রেজিস্ট্রি অফিসের ভলিউমের ক্রমিক ও দলিল নম্বরের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হবে।

২. স্বাক্ষর ও সিল পরীক্ষা: 
অনেকে অন্যের স্বাক্ষর নকল করে বিক্রেতা সেজে জমি রেজিস্ট্রি করে থাকে। স্বাক্ষর নিয়ে সন্দেহ হলে অভিজ্ঞ হস্তরেখা বিশারদের মাধ্যমে তা যাচাই করা যেতে পারে। পাশাপাশি দলিলের বিভিন্ন সিল ও স্বাক্ষরের ধরন সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।

৩. সিল ও তারিখের সামঞ্জস্য:  
কোনো দলিল যদি অনেক পুরোনো সময়ের দাবি করা হয়, তবে তাতে ব্যবহৃত সিলের ধরনও তৎকালীন আমলের হতে হবে। পুরোনো দলিলে সাম্প্রতিক বা আধুনিক ধাঁচের সিল থাকলে সেটি জাল হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। এছাড়া দলিলটি যে তারিখে রেজিস্ট্রি হয়েছে, সেদিন কোনো সরকারি ছুটি ছিল কি না—তা ক্যালেন্ডার দেখে যাচাই করে নিন।

৪. এক জমির একাধিক দাবিদার:  
যদি একই জমির একাধিক ব্যক্তি মালিকানা দাবি করে থাকেন, তবে ধরে নিতে হবে কোনো না কোনো পক্ষ জাল দলিলের আশ্রয় নিয়েছে। এমন ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিকভাবে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে এবং সরেজমিনে তদন্ত করে জমির মূল দখলদার ও প্রকৃত ইতিহাস জানার চেষ্টা করতে হবে।

৫. নামজারি বা মিউটেশন যাচাই: 
সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসি ল্যান্ড অফিস থেকে নামজারির খতিয়ান ও রেকর্ড পরীক্ষা করুন। সিএস (CS) জরিপ থেকে শুরু করে বর্তমান বিক্রেতা পর্যন্ত ধারাবাহিক খতিয়ান ও দলিলের লিংক ঠিক আছে কি না তা পরখ করুন। এছাড়া প্রতিবার হাতবদলের ক্ষেত্রে জমির পরিমাণ, দাগ নম্বর ও ঠিকানায় কোনো অমিল রয়েছে কি না তা সতর্কতার সঙ্গে দেখা উচিত।

৬. পাওয়ার অব অ্যাটর্নি (আমমোক্তারনামা) যাচাই: 
জমি যদি পাওয়ার অব অ্যাটর্নি বা আমমোক্তারনামার মাধ্যমে বিক্রি হয়, তবে দলিলটি রেজিস্ট্রিকৃত কি না এবং সাম্প্রতিক দলিলের ক্ষেত্রে দাতা ও গ্রহীতা উভয়ের ছবি যথাযথভাবে সংযুক্ত আছে কি না তা ভালো করে দেখে নিন।

৭. দানপত্র (হেবানামা) দলিল যাচাই:  
জমিটি যদি দানসূত্রে পাওয়া হয়, তবে দেখতে হবে দলিলটি সম্পাদনের কতদিন পর গ্রহীতা জমিটির দখল পেয়েছেন। এছাড়া দলিলদাতার সঙ্গে দানগ্রহীতার রক্ত বা আইনি সম্পর্ক এমন দান পাওয়ার উপযোগী কি না, তাও নিশ্চিত হতে হবে।

৮. দলিল লেখকের পরিচয় নিশ্চিতকরণ:  
দলিল নিয়ে কোনো ধোঁয়াশা থাকলে দলিলের গায়ে থাকা ‘দলিল লেখক’-এর নাম, লাইসেন্স নম্বর ও ঠিকানা অনুযায়ী তাঁর সঙ্গে সরাসরি কথা বলুন। তিনি দলিলটি লিখেছেন কি না বা কোনো অসংগতি আছে কি না, তা তাঁর মাধ্যমেই স্পষ্ট হওয়া সম্ভব।

৯. স্ট্যাম্প ও ভেন্ডারের তথ্য যাচাই: 
দলিল তৈরিতে ব্যবহৃত জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পের পেছনের অংশে কোন ভেন্ডারের কাছ থেকে, কোন তারিখে এবং কার নামে স্ট্যাম্প কেনা হয়েছে তা উল্লেখ থাকে। স্ট্যাম্পের ক্রমিক নম্বর ঠিক আছে কি না এবং তা যথাযথ লাইসেন্সধারী ভেন্ডারের কাছ থেকে কেনা হয়েছে কি না, তা যাচাই করুন।

উপসংহার
জমি কেনা প্রতিটি মানুষের জীবনের অন্যতম বড় আর্থিক ও আবেগীয় সিদ্ধান্ত। সামান্য অসাবধানতা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেও চরম আইনি জটিলতায় ঠেলে দিতে পারে। তাই জমি কেনার আগে দলিল ও রেকর্ডের সঠিকতা নিশ্চিতে রেজিস্ট্রি অফিস ও ভূমি অফিস থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই করে নেওয়া আবশ্যক।

লেখক পরিচিতি সংক্ষেপে:

গ্রন্থটির লেখক ড. পি. এম. সিরাজুল ইসলাম (সিরাজ প্রামাণিক) বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের একজন নিয়মিত আইনজীবী ও গবেষক। তিনি আইনের ওপর পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন। সাংবাদিকতা ও আইন পেশার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে তিনি সাধারণ মানুষের আইনি সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ‘পকেট আইন’, ‘আইনে আপনার যত অধিকার’, ‘জমি ক্রয়-বিক্রয় আইন’সহ বহু জনপ্রিয় আইনবিষয়ক গ্রন্থ রচনা করেছেন।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।