দেশে দুধের ৪১ নমুনার সবকটিতেই মিলল মাইক্রোপ্লাস্টিক

অনলাইন ডেস্কঃ
২৯ জুলাই, ২০২৬ ১২:১৩ পিএম
শেয়ার করুন:
দেশে দুধের ৪১ নমুনার সবকটিতেই মিলল মাইক্রোপ্লাস্টিক

বাংলাদেশের বাজারে বিক্রিত কাঁচা দুধ, প্যাকেটজাত তরল ও গুঁড়া দুধ এবং অন্যান্য দুগ্ধজাত পণ্যে মারাত্মক ক্ষতিকর মাইক্রোপ্লাস্টিক বা ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণার উপস্থিতি মিলেছে। সম্প্রতি এক গবেষণায় পরীক্ষা করা ৪১টি নমুনার **সবকটিতেই** এই প্লাস্টিক কণার অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। এর মধ্যে খোলা বাজারের কাঁচা দুধের চেয়ে নামিদামি ব্র্যান্ডের প্যাকেটজাত দুধে মাইক্রোপ্লাস্টিকের ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি। 

যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) পুষ্টি ও খাদ্যপ্রযুক্তি বিভাগের একদল গবেষকের গবেষণায় এই আতঙ্কজনক তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণাটির অর্থায়ন করেছে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)।

গবেষণার মূল তথ্য ও পরিসংখ্যান

গবেষক দলটি দেশের বিভিন্ন এলাকা (ঢাকা, যশোর, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, রংপুর ইত্যাদি) ও সুপারশপ থেকে মোট ৪১টি নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা চালায়। 

পরীক্ষার ফলাফলে দেখা যায়:
ব্র্যান্ডের দুধ (প্যাকেটজাত ও গুঁড়া): প্রতি ১০০ মিলিলিটারে গড়ে ১৫৬.০৬টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা রয়েছে, যা সর্বোচ্চ।
কাঁচা দুধ: প্রতি ১০০ মিলিলিটারে গড়ে ৯৩.৩৯টি কণা পাওয়া গেছে।
অন্যান্য দুগ্ধজাত পণ্য: প্রতি ১০০ মিলিলিটারে গড়ে ৭০.৮০টি কণা শনাক্ত হয়েছে।

প্লাস্টিক কণার ধরন ও উৎস

অত্যাধুনিক প্রযুক্তির (FTIR) মাধ্যমে পরীক্ষার পর দেখা যায়, দুধে পাওয়া মাইক্রোপ্লাস্টিকের বড় একটি অংশ (প্রায় ৭৭ থেকে ৮২ শতাংশ) স্বচ্ছ ও সুতার মতো সূক্ষ্ম আঁশ আকৃতির। এগুলোর বেশিরভাগের আকারই ২৫০ মাইক্রোমিটারের কম।

কীভাবে দুধে প্লাস্টিক ঢুকছে?
গবেষকদের মতে, দুধ সংগ্রহ, কারখানায় পরিবহন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্যাকেজিং এবং প্লাস্টিকের পাইপ, ফিল্টার, কর্মীদের পোশাকের কৃত্রিম তন্তু ও বাতাস থেকে এসব ক্ষুদ্র কণা দুধে মিশছে। 

গবেষণায় ক্ষতিকর টেফলন (PTFE), পিইটি (PET), নাইলন-৬, পলিইথিলিন, পিভিসি ও পলিপ্রোপিলিনের মতো মানবদেহের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বিভিন্ন প্লাস্টিক পলিমার শনাক্ত করা হয়েছে।

শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে

বয়স ও শরীরের ওজনের তুলনায় দুধ গ্রহণের অনুপাত বেশি হওয়ায় প্রাপ্তবয়স্কদের চেয়ে শিশুদের শরীরে সবচেয়ে বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রবেশ করছে। বিশেষ করে ৪ থেকে ১০ বছর বয়সী যে শিশুরা ব্র্যান্ডের প্যাকেটজাত দুধ পান করে, তারা সবচেয়ে বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে। 

রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে পলিমারভিত্তিক ঝুঁকি সূচকে কাঁচা দুধকে ‘উচ্চ ঝুঁকি’, ব্র্যান্ডের দুধকে ‘উল্লেখযোগ্য ঝুঁকি’ এবং অন্যান্য দুগ্ধজাত পণ্যকে ‘মাঝারি ঝুঁকি’ হিসেবে শ্রেণিভুক্ত করা হয়েছে।

গবেষকদের পরামর্‍শ ও সুপারিশ

গবেষণাদলের প্রধান যবিপ্রবি শিক্ষক সানাউল্লাহ মাজুমদার জানান, এটি বাংলাদেশের দুগ্ধ সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য একটি উদীয়মান খাদ্যনিরাপত্তা সংকট। এই দূষণ প্রতিরোধে তারা কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপের সুপারিশ করেছেন:

১. দুধ উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের প্রতিটি ধাপে প্লাস্টিকের ব্যবহার কমাতে হবে।  
২. প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানায় উন্নত ফিল্টার ব্যবস্থা চালু করতে হবে।  
৩. কম প্লাস্টিক নির্গমনকারী আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার বাড়াতে হবে।  
৪. বাজারে থাকা দুধের মান নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত ল্যাব পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।